RSS

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন (১৮৫৭-১৯৪৭): একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস :: পর্ব ৩

05 জানু.

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৩ এপ্রিল, ১৯১৯)

১৯১৯ সালের ১০ এপ্রিল ড. কিচলু ও ড. সত্যপালকে সত্যাগ্রহ আন্দোলনে জড়িত থাকার দায়ে রাওলাট আইনে গ্রেফতার করা হয়। এর ফলে পাঞ্জাব অশান্ত হয়ে ওঠে। এই গ্রেফতারের বিরুদ্ধে অমৃতসরের মানুষ মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ফলত উন্মত্ত জনতার হাতে পাঁচ জন ইউরোপীয়ের প্রাণহানি ঘটে। ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ নামে একটি উদ্যানে মহিলা ও শিশুসহ সহস্রাধিক মানুষ সমবেত হয়। সভা শুরু হওয়ার আগেই জেনারেল ও’ডায়ারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ বিনা প্ররোচনায় সভাস্থলে গুলিবর্ষণ করে। উদ্যানটি আবদ্ধ হওয়ায় সমবেত জনতার বের হওয়ার পথ ছিল না। এতে শতাধিক পুরুষ, মহিলা ও শিশু নিহত হয়। ১২০০ জন আহত হয়। এই ঘটনা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপরই জাতীয় রাজনীতিতে গান্ধীজির উত্থান ঘটে।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্যার’ উপাধি বর্জন করেন। অনেক বছর পরে ১৯৪০ সালের ১৩ মার্চ পাঞ্জাবের বীর যুবক সর্দার উধম সিং ইংল্যান্ডে গিয়ে লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে একটি জনসভায় ও’ডায়ারকে গুলি করে হত্যা করেন। সেই বছরই ৩১ জুলাই ইংল্যান্ডে উধম সিংকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ৩৪ বছর পর ১৯৭৪ সালের ১৯ জুলাই শহিদ উধম সিংয়ের দেহাবশেষ ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়।

খিলাফত আন্দোলন (১৯২০)

তুরস্কের সুলতান ছিলেন মুসলমানদের ধর্মগুরু বা খলিফা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় খলিফার সঙ্গে ব্রিটিশদের বিরোধ বাধলে ভারতীয় মুসলমানেরা খলিফার সম্মান রক্ষার্থে ব্রিটিশবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৯২০ সালে মহম্মদ আলি ও শৌকত আলি নামে দুই ভাই ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল খিলাফত বা খলিফা-পদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই আন্দোলনকে সমর্থন করলে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের পথ সুগম হয়।

অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০)

খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করল কংগ্রেস। সুদৃঢ় হল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য। সেই সুযোগে গান্ধীজি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিলেন। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে কংগ্রেস স্বরাজকে চূড়ান্ত লক্ষ্য করে অহিংস অসহযোগের প্রস্তাব পাস করল। ব্রিটিশদের দেওয়া সম্মান ও উপাধি ফিরিয়ে দেওয়া হতে লাগল। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সরকার-মনোনীত সদস্যরা পদত্যাগ করলেন। সরকারি দরবার সহ অন্যান্য সরকারি অনুষ্ঠান বয়কট করা হল। আইনজীবীরা ব্রিটিশ আদালতে যেতে অস্বীকার করলেন। সাধারণ মানুষ সামরিক ও অন্যান্য সরকারি পদ গ্রহণে অস্বীকার করল। বিদেশি পণ্যও বয়কট করা হল।

আলি ভ্রাতৃদ্বয়কে সঙ্গে নিয়ে গান্ধীজি সারা দেশ ঘুরে কয়েকশো সভায় ভাষণ দিলেন। বাংলায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বয়কট বিশেষভাবে সফল হল। লালা লাজপৎ রায়ের নেতৃত্বে ভাল সাড়া পাওয়া গেল পাঞ্জাবেও। আন্দোলন সফল হল বোম্বাই, যুক্তপ্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ও মাদ্রাজেও। আদালত বয়কটের সময় মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশ, রাজাগোপালাচারী, সৈফুদ্দিন কিচলু, বল্লভভাই প্যাটেল, অরুণা আসফ আলি প্রমুখ বিশিষ্ট আইনজীবী তাঁদের লাভজনক পেশা পরিত্যাগ করলেন।

গান্ধীজির অনুগামীরা অসহযোগ আন্দোলনের সময় দোকানে দোকানে পিকেটিং চালাল। এই সময় প্রিন্স অফ ওয়েলসের ভারত সফরকে ঘিরে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। ১৯২১ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি বোম্বাই বন্দরে পদার্পণ করলেন। কিন্তু যেখানেই গেলেন সেখানেই দেখলেন খালি রাস্তা আর বন্ধ দোকানপাট। অসহযোগ আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে দেশজুড়ে কৃষক আন্দোলন, পাঞ্জাবে অকালি আন্দোলন, আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের ধর্মঘট ও অজস্র স্থানীয় আন্দোলনও শুরু হয়ে গেল। দেশজুড়ে সকলেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হলেন।

চৌরিচৌরার ঘটনা (১৯২২)

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে গান্ধীজিকে নেতা করে একটি আইন অমান্য আন্দোলনও শুরু করার প্রস্তাব গৃহীত হল। কিন্তু গান্ধীজি এই আন্দোলন শুরু করার আগেই যুক্তপ্রদেশের গোরখপুরের কাছে চৌরাচৌরা গ্রামে উন্মত্ত জনতা একটি পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে। পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হলে জনতা ফাঁড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এর ফলে ২২ জন পুলিশকর্মীর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় ব্যথিত হয়ে গান্ধীজি ১৯২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বরদৌলিতে কংগ্রেস কর্মসমিতির সভা ডেকে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। চৌরিচৌরার ঘটনা বিশ্লেষণ করে গান্ধীজির মনে হয় যে, দেশের মানুষ এখনও গণ-আইনঅমান্য আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত নয়। এতদ্সত্ত্বেও গান্ধীজিকে গ্রেফতার করে ছয় বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

স্বরাজ্য দল (১৯২২)

এদিকে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশ ও এন. সি. কেলকর গান্ধীজির সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে স্বরাজ্য দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি ‘কংগ্রেস-খিলাফত স্বরাজ্য দল’ নামে এই দল স্থাপিত হয়। তবে বিকল্প কর্মসূচি হিসেবে স্বরাজ্য দল সর্বব্যাপী আইন অমান্য আন্দোলনের বদলে নরমপন্থী আন্দোলনের কথা বলে। স্বরাজ্য দলের কৌশল ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের ফলে গঠিত আইনসভাগুলিতে যোগ দিয়ে সেগুলিকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া এবং সরকারের উপর নীতিগত চাপ সৃষ্টি করে জনস্বার্থে গৃহীত স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্তগুলি কার্যকর করা।

১৯২৩ সালের নির্বাচনে ১৪৫টি আসনের মধ্যে ৪৫টি দখল করে স্বরাজ্য দল। প্রাদেশিক নির্বাচনে এই দল তেমন সাফল্য না দেখাতে পারলেও মধ্যপ্রদেশে স্বরাজ্য দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বাংলাতেই স্বরাজ্য দল বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর স্বরাজ্য দল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে থাকে। তাঁরা রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসন ও ব্রিটিশ সরকারের দমনমূলক আইনগুলি প্রত্যাহারের দাবি জানাতে থাকেন। কিন্তু ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর থেকে তাঁরা ক্রমশ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার পথ ধরেন। এতে দলের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে ১৯২৬ সালে স্বরাজ্য দল ভেঙে যায়।

সাইমন কমিশন (১৯২৭)

স্বরাজ্য দলের কার্যকলাপ ব্রিটিশ সরকারকে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারে প্রবর্তিত দ্বৈত শাসনব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করে। সরকার ভারতে আরও বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠন করা যায় কিনা সেই ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু করে। এই কাজের জন্য ১৯২৭ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিস সরকার সাইমন কমিশন নিয়োগ করে। কিন্তু এই কমিশনের সকল সদস্যই ছিলেন ইউরোপীয়। এহেন ব্যবস্থায় ভারতীয় নেতৃবর্গ অপমানিত হন এবং কমিশন বয়কট করেন। তেজ বাহাদুর সপ্রুর নেতৃত্বে লিবারাল ফেডারেশন, ভারতীয় শিল্প ও বাণিজ্য কংগ্রেস এবং হিন্দু মহাসভা এই কমিশন বয়কটের সিদ্ধান্ত নিলেন। এই প্রসঙ্গে মুসলিম লিগ দ্বিধাবিভক্ত হল। লিগের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নেতা মহম্মদ আলি জিন্নাহের নেতৃত্বে বয়কট সমর্থন করলেন।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বয়কটকে আন্দোলনের রূপ দিলেন। ১৯২৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সাইমন ও তাঁর সহকর্মীরা বোম্বাইতে অবতরণ করামাত্র আন্দোলন শুরু হল। দেশের প্রত্যেকটি ছোটো ও বড়ো শহরে হরতাল পালিত হল। মানুষ পথে নেমে প্রতিবাদ-মিছিলে যোগ দিল। সাইমন কমিশনকে দেখানো হল কালো পতাকা। যেখানেই কমিশন গেল সেখানেই আওয়াজ উঠল ‘গো ব্যাক সাইমন’ (‘সাইমন ফিরে যাও’)। লাহোরে বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের নির্বিচারে লাঠিচালনায় প্রবীণ নেতা লালা লাজপৎ রাই আহত হলেন, পরে সেই আঘাতই তাঁর মৃত্যু ঘটল। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে বিপ্লবী ভগৎ সিং ও তাঁর সহযোগীরা সন্ডার্স নামে এক ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারকে হত্যা করে লাজপৎ রায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ তুললেন।

 

ট্যাগ সমুহঃ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: