RSS

[সহজ ভাষায় উপনিষদ্] কেনোপনিষদ্

সামবেদীয়

কেনোপনিষদ্

বা

তলবকারোপনিষদ্

অনুবাদ © অর্ণব দত্ত

ওঁ

 Jagaddhatri-Naagyagnopabeetini

কে মনকে চালনে করে মনের দিকে নিয়ে যান? শরীরের প্রধান প্রাণকে কে নিযুক্ত করে তার কর্ম করিয়ে নেন? লোককে কে এই সব বাক্য উচ্চারণ করান? চোখ ও কানকে কোন দেবতাই বা নিজের নিজের কাজে যুক্ত রাখেন? ১ ।।

 

যিনি কানেরও কান, মনেরও মন, বাক্যেরু বাক্য; তিনিই প্রাণের প্রাণ, চোখের চোখ―এই জ্ঞান অর্জন করে ‘চোখ, কান ইত্যাদি আমার’―এই ধারণা জ্ঞানীগণ পরিত্যাগ করেন। তখন তাঁরা ইহলোকের উর্ধ্বে উঠে অমরত্ব অর্জন করেন ।। ২ ।।

 

ব্রহ্মকে চোখে দেখা যায় না। তাঁকে বাক্য দিয়ে বোঝানো যায় না। মন তাঁকে ধরতে পারে না। আমরা তাঁকে জানি না। কিভাবে তাঁর উপদেশ দিতে হয় তাও জানি না। জানা ও অজানা সকল বস্তুর মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ অথব সবার থেকে আলাদা। যাঁরা ব্রহ্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন, তাঁদের কাছে শুনেছি― ৩ ।।

 

যিনি বাক্যের দ্বারা প্রকাশিত নন; বরং বাক্য যাঁর দ্বারা উচ্চারিত হয়, তাঁকেই তুমি ব্রহ্ম বলে জানো। লোকে এই যে সামান্য বস্তুর উপাসনা করে, এ ব্রহ্ম নয় ।। ৪ ।।

Read the rest of this entry »

Advertisements
 

ট্যাগ সমুহঃ

[সহজ ভাষায় উপনিষদ্] ঈশোপনিষদ্

শুক্লযজুর্বেদীয়

ঈশোপনিষদ্

বা

বাজসনেয় সংহিতোপনিষদ্

অনুবাদ © অর্ণব দত্ত

ওঁ

জগতে যা কিছু রয়েছে সবই পরব্রহ্মের দ্বারা আচ্ছাদিত―এই জেনে বিষয়বুদ্ধি ত্যাগ করবে। এই ত্যাগের দ্বারাই ব্রহ্মকে সম্ভোগ করবে; অন্যের ধনসম্পত্তিতে লোভ করবে না ।। ১ ।।

যার ব্রহ্মজ্ঞান হয়নি, সে কর্মের মাধ্যমে একশো বছর বেঁচে থাকতে চাইবে। হে মানব, এইরকম জীবনের ইচ্ছা থাকলে তোমার পক্ষে এমন কোনো পথ নেই, যা তোমাকে অশুভ কর্মের লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে ।। ২ ।।

অজ্ঞানতার অন্ধকারে ঢাকা অনেক লোক আছে। যারা অবিদ্যার বশবর্তী হয়ে আত্মাকে অস্বীকার করে, তারাই মৃত্যুর পর সেই সব লোকে যায় ।। ৩ ।।

ব্রহ্ম এক। তিনি নিশ্চম হলেও মনের চেয়েও দ্রুতগামী। তিনিই সকলের আগে চলেন। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তাঁকে ধরা সম্ভব নয়। তিনি স্থির থেকেও অন্যান্য সচল বস্তুকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যান। তিনি পরব্রহ্ম রূপে আছেন বলেই, বায়ু প্রাণীর দেহধারণের প্রচেষ্টাকে সফল করছেন ।। ৪ ।।

তিনি চলেও চলেন না। দূরে থেকেও কাছে থাকেন। তিনি সকলের অন্তরে আছেন, আবার সকলের বাইরেও আছেন ।। ৫ ।।

Read the rest of this entry »

 

ট্যাগ সমুহঃ

লক্ষ্মীনৃসিংহস্তোত্রম্

শ্রীমৎপয়োনিধিনিকেতন চক্রপাণে ভোগীন্দ্রভোগমণিরঞ্জিতপূণ্যমূর্তে।

যোগীশ শ্বাশত শরণ্য ভবাব্ধিপোত লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্।।১।।

ব্রহ্মেন্দ্ররুদ্রমরুদর্ককীরিটকোটিসংঘট্টিতাঙ্ঘ্রিকমলামলকান্তিকান্ত।

লক্ষ্মীলসৎকুচসরোরুহরাজহংস লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।২।।

সংসারঘোরগহনে চরতো ভূরারেভারোগ্রভীকরমৃগিপ্রবরার্দিতস্য।

আর্তস্য মৎসরনিদাঘনিপীড়িতস্য লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।৩।।

সংসারকূপমতিঘোরমগাধমূলং সংপ্রাপ্য দুঃখশতসর্পসমাকূলস্য।

দীনস্য দেব করুণাপদমাগতস্য লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।৪।।

সংসারসাগরবিশালকরালকালনক্রগ্রহগ্রসননিগ্রহবিগ্রহস্য।

ব্যগ্রস্যরাগরসনোর্মিনিপীড়িতস্য লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।৫।।

সংসারবৃক্ষমঘবীজমনন্তকর্মশাখাশতং করণপত্রমনঙ্গপুষ্পম্‌।

আরুহ্য দুঃখফলিতং পততো দয়ালো লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।৬।।

সংসারসর্পধনবক্ত্রভয়োগ্রতীব্রদংষ্ট্রাকরালবিষদগ্‌ধবিনষ্টমূর্তে।

নাগারিবাহন সুধাব্ধিনিবাস শৌরে লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।৭।।

সংসারদাবদহনাতুরভীকরোরুজ্বালাবলীভিরতিদগ্‌ধতনুরুহস্য।

ত্বৎপাদপদ্মসরসীশরণাগতস্য লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।৮।।

সংসারজালপতিতস্য জগন্নিবাস সর্বেন্দ্রিয়ার্থবড়িশার্থঝষোপমস্য।

প্রোৎখণ্ডিতপ্রচুরতালুকমস্তকস্য লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।৯।।

সংসারভীকরকরীন্দ্রকলাভিঘাতনিষ্পিষতমর্মবপুষঃ সকলার্তিনাশ।

প্রাণপ্রয়াণভবভীতিসমাকুলস্য লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।১০।।

অন্ধস্য মে হৃতবিবেকমহাধনস্য চোরৈঃ প্রভো বলিভিরিন্দ্রিয়নামধেয়ৈঃ।

মোহান্ধকূপকুহরে বিনিপাতিতস্য লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।১১।।

লক্ষ্মীপতে কমলনাভ সুরেশ বিষ্ণো বৈকুণ্ঠ কৃষ্ণ মধুসূদন পুষ্করাক্ষ।

ব্রহ্মণ্য কেশব জনার্দন বাসুদেব দেবেশ দেহি কৃপণস্য করাবলম্বম্‌।।১২।।

লক্ষ্মীনৃসিংহচরণাব্জমধুব্রতেন স্তোত্রং কৃতং সুখকরং ভুবি শংকরেণ।।

যে তৎপথন্তি মনুজ হরিভক্তিযুক্তঃ লক্ষ্মীনৃসিংহ মম দেহি করাবলম্বম্‌।।১৩।।

ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকাচার্যশ্রীমচ্ছঙ্করাচ্চার্যবিরচিতং সংকষ্টনাশনং লক্ষ্মীনৃসিংহস্তোত্রং সম্পূর্ণম্‌।।

বঙ্গানুবাদ—

হে প্রভু, তুমি শ্রীপতি, ক্ষীরসমুদ্রনিবাসী, সুদর্শন-চক্রধারী, যোগীশ্বর; নাগরাজ অনন্তদেব তোমার মস্তকের মণিস্বরূপ; তুমি শরণাগতকে ভবসাগর পার করাও; হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ১।।

ব্রহ্মা, ইন্দ্র, শিব, মরুৎগণ ও সূর্য তাঁদের কোটি মুকুট তোমার পায়ে অর্পণ করেন। তোমার পদযুগল লক্ষ্মীর পরম প্রিয়। তিনি (লক্ষ্মীদেবী) তোমার বক্ষপদ্মে রাজহংসীরূপে বিরাজ করেন। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ২।।

সংসারী মানুষ জন্মমৃত্যুর চক্রপথে দাবাগ্নিগ্রস্থ প্রাণীর মতো দগ্ধ হয়। শরীর দগ্ধ হওয়ার ভয়ে সে কাঁদে। দাবাগ্নিগ্রস্থ প্রাণী যেমন জলাশয়ে আশ্রয় খোঁকে, তেমনি সংসারদাবাগ্নিগ্রস্থ আশ্রয় নেয় তোমার পাদপদ্মরূপ জলাশয়ে। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ৩।।

এই বিশ্বচরাচরে আমি জন্মমৃত্যুর চক্রপাকে পড়েছি। মাছ যেমন করে টোপ গেলে, তেমনি করে কাম্যবস্তুর টোপ সাগ্রহে গিলেছি। মাছ ছটফট করলে তার মাথাটি যেমন কেটে নেওয়া হয়, তেমনি আমি আমার আত্মস্বরূপ বিস্মৃত হয়ে জাগতিক প্রবৃত্তির দ্বারা দণ্ডিত হচ্ছি। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ৪।।

জন্মমৃত্যুর করাল অতল কূপে পড়ে আমি সহস্রদুঃখরূপ সর্পের দ্বারা দংশিত হচ্ছি। এই পতিত অবস্থায়, হে প্রভু, তোমার কৃপায় আমি তোমার পাদপদ্ম আশ্রয় করেছি। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ৫।।

হস্তীর ন্যায় শক্তিশালী দৈত্যপতি হিরণ্যকশিপুকে তুমি দুই হাতে নিষ্পেষিত করে হত্যা করেছো। এইভাবেই তুমি ভয়াবহ জন্মমৃত্যুচক্রের সকল দুঃখ নাশ করো। যারা সংসারের তাপে দগ্ধ হয়, তাদের তুমি শেষ গতি। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ৬।।

জাগতিক সত্ত্বারূপ সর্পের শতসহস্র দন্তের আঘাতে আমি জর্জরিত। আমি যে শ্রীকৃষ্ণের চিরদাস, সেই সত্য এই করাল বিষ শরীরে ধারণ করে আমি বিস্মৃত হয়েছি। এই সর্পবিষের শ্রেষ্ঠ প্রতিষেধক হল অমৃত। হে শৌরী, তুমিই অমৃতসাগরের অধিবাসী, তোমার বাহন সর্পত্রাস গরুড়। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ৭।।

পাপচিন্তার বীজ থেকে জন্ম হয় সংসারবৃক্ষের। সকাম কর্মের প্রতিফল এর শাখাপ্রশাখা, ইন্দ্রিয়াদি এর পাতা এবং কামচেতনা এর পুষ্প। হে দয়াল, আমি এই বৃক্ষে আরোহণ করে শুধুই দুঃখময় ফল পেয়েছি। তাই এখন পতিত হয়েছি। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ৮।।

সংসারসাগরে সংসারবন্ধনরূপ শক্তিশালী তরঙ্গ আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করছে। কালকুম্ভীরের করাল চোয়ালে আমি আবদ্ধ হয়েছি। এই কুম্ভীর আমাকে বিদীর্ণ করে গ্রাস করছে। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ৯।।

জাগতিক মায়ারূপ ভয়াল হস্তীরাজ আমাকে আঘাত করছে। আমার শরীরের প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। আমি যন্ত্রণায় বিদ্ধ হচ্ছি। আমার প্রাণসংশয় উপস্থিত। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ১০।।

ভেদবুদ্ধি আমাকে অন্ধ করেছে। ইন্দ্রিয়রূপ চোরে আমাকে চুরি করেছে। আমি অন্ধ হয়ে কামনার গভীর কূপে পতিত হয়েছি। হে লক্ষ্মীনৃসিংহ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ১১।।

হে লক্ষ্মীপতি, পদ্মনাভ, সুরেশ্বর, পদ্মনয়ন বিষ্ণু। তুমিই বৈকুণ্ঠ, তুমিই কৃষ্ণ, তুমিই মধুসূদন। তুমিই ব্রহ্ম, তুমিই কেশব, তুমিই জনার্দন, তুমিই বাসুদেব। হে দেবেশ, তোমার করপদ্মস্পর্শে আমাকে ধন্য করো।। ১২।।

বিশ্বের মঙ্গলকারী এই স্তবটি লক্ষ্মীনৃসিংহপাদপদ্মে মধুপরূপী শঙ্করাচার্য কর্তৃক রচিত হল। যাঁরা হরিভক্তিসহকারে এই স্তবটি পাঠ করবেন, তাঁরা লক্ষ্মীনৃসিংহের পাদপদ্মে চিরতরে আশ্রয় পাবেন।। ১৩।।

স্তবপরিচয়:

লক্ষ্মীনৃসিংহস্তোত্র আদি শঙ্করাচার্যের রচনা। এটি লক্ষ্মীনৃসিংহ করাবলম্ব বা লক্ষ্মীনৃসিংহকরুণরসস্তোত্র নামেও পরিচিত। কথিত আছে, এক কাপালিক শঙ্করাচার্যকে বন্দী করে কালীর নিকট বলি দিতে গেলে, লক্ষ্মীনৃসিংহ তাঁকে উদ্ধার করেন, এরপর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে শঙ্কর এই স্তবটি রচনা করেন।

লক্ষ্মীনৃসিংহস্তোত্রটি দক্ষিণভারতে সুপ্রচলিত হলেও, বাংলায় এটি স্বল্পপরিচিত। তাই আমার নিত্যপূজিত ভগবান শ্রীশ্রীমহাবিষ্ণু লক্ষ্মীনৃসিংহ জীউ-র পাদপদ্মে এই অনুবাদ-অঞ্জলিটি প্রদান করলাম।

 
5 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন নভেম্বর 26, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

শিবপূজাপদ্ধতি

যাঁদের HTML সেভ করে রাখতে অসুবিধা হয়, তাঁরা এই পৃষ্ঠাটি সুন্দর করে সাজানো পিডিএফ ফাইলের আকারে ডাউনলোড করে রাখতে পারেন।

ডাউনলোড লিঙ্ক-

http://www.mediafire.com/view/?kad0pf125egasdn

শিবপূজার সাধারণ পদ্ধতি এখানে বর্ণিত হল। এই পদ্ধতি অনুসারে প্রতিদিন বা প্রতি সোমবার প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ বা বাণেশ্বর শিবলিঙ্গে শিবের পূজা করতে পারেন। যাঁরা ‘সোমবার ব্রত’ করেন, তাঁরাও এই পদ্ধতি অনুসারে শিবপূজা করে ব্রতকথা পাঠ করতে পারেন। মনে রাখবেন, সাধারণ শিবলিঙ্গ ও বাণেশ্বর শিবলিঙ্গে পূজার মন্ত্র আলাদা। যাঁদের বাড়িতে বাণেশ্বর আছেন, তাঁরাই বাণেশ্বর মন্ত্রে শিবের পূজা করবেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে সাধারণ শিবপূজার মন্ত্রেই পূজা করবেন। শিবরাত্রির দিন বিশেষভাবে পূজা করার নিয়ম আছে। সেই পদ্ধতি পরে দেওয়া হবে।

সকালে সূর্যোদয়ের তিন ঘণ্টার মধ্যে পূজা সেরে নেওয়াই উচিত। একান্ত অসমর্থ হলে খেয়াল রাখতে হবে যেন বেলা বারোটার মধ্যেই পূজা সেরে ফেলা যায়। তার পর সকালের পূজা করা উচিত নয়। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়া অন্যেরা কিছু না খেয়েই পূজা করবেন। সকালে স্নান ও আহ্নিক উপাসনা সেরে শিবপূজায় বসবেন। প্রথমে পূজার সামগ্রীগুলি একত্রিত করে গুছিয়ে নিন। প্রতিদিন শিবপূজা করলে অনেক সময় ফুল-বেলপাতা ইত্যাদি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেক্ষেত্রে ওই সব উপাচারের নাম ও মন্ত্র উচ্চারণ করে সামান্যার্ঘ্য (জলশুদ্ধি) জল দিয়ে পূজা করলেই চলে। ধূপ ও প্রদীপ জ্বেলে নিন। শিব, শ্রীগুরু ও ইষ্টদেবতাকে প্রণাম করে তিন জনকে অভিন্ন চিন্তা করতে করতে যথাশক্তি দীক্ষামন্ত্র জপ করবেন। তারপর করজোড়ে এই মন্ত্রটি পাঠ করবেন—

ওঁ  সর্বমঙ্গলমাঙ্গল্যং বরেণ্যং বরদং শুভম্।

নারায়ণং নমস্কৃত্য সর্বকর্মাণি কারয়েৎ।।

আচমন

ডান হাতের তালু গোকর্ণাকৃতি করে মাষকলাই ডুবতে পারে এই পরিমাণ জল নিয়ে ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রটি পাঠ করে পান করুন। এইভাবে মোট তিন বার জলপান করে আচমন করার পর হাত জোড় করে এই মন্ত্রটি পাঠ করুন—

ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ

দিবীব চক্ষুরাততম্।

ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।

যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।।

জলশুদ্ধি

তাম্রপাত্রে বা কোশায় গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল নিয়ে মধ্যমা দ্বারা সেই জল স্পর্শ করে এই মন্ত্রটি পাঠ করুন—

ওঁ  গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরি সরস্বতি।

নর্মদে সিন্ধু-কাবেরি জলেঽস্মিন সন্নিধিং কুরু।

সূর্যমণ্ডল থেকে সকল তীর্থ সেই পার্শ্বস্থ জলে এসে উপস্থিত হয়েছেন এই চিন্তা করতে করতে সেই জলে একটি ফুল দিয়ে তীর্থপূজা করুন। তীর্থপূজার মন্ত্রটি হল—

ওঁ  এতে গন্ধপুষ্পে তীর্থেভ্যো নমঃ।

এরপর এই জল সামান্য কুশীতে নিয়ে পূজাদ্রব্যের উপর ও নিজের মাথায় ছিটিয়ে দিন।

আসনশুদ্ধি

যে আসনে বসেছেন, সেই আসনটিতে একটি ফুল দিয়ে হাত জোড় করে এই মন্ত্রটি পাঠ করুন—

ওঁ পৃথ্বি ত্বয়া ধৃতা লোকা দেবি ত্বং বিষ্ণুনা ধৃতা।

ত্বঞ্চ ধারায় মাং নিত্যং পবিত্রং কুরু চাসনম্।।

পুষ্পশুদ্ধি

পুষ্প স্পর্শ করে এই মন্ত্রটি পাঠ করুন—

ওঁ পুষ্পে পুষ্পে মহাপুষ্পে সুপুষ্পে পুষ্পসম্ভবে। পুষ্পাচয়াবকীর্ণে চ হুঁ ফট্ স্বাহা।

ভূতশুদ্ধি

হাত জোড় করে মনে মনে এই চারটি মন্ত্র পাঠ করুন—

ওঁ ভূতশৃঙ্গাটাচ্ছিরঃ সুষুম্নাপথেন জীবশিবং

পরমশিবপদে যোজয়ামি স্বাহা ।। ১ ।।

ওঁ যং লিঙ্গশরীরং শোষয় শোষয় স্বাহা ।। ২ ।।

ওঁ রং সংকোচশরীরং দহ দহ স্বাহা ।। ৩ ।।

ওঁ পরমশিব সুষুম্নাপথেন মূলশৃঙ্গাটমুল্লসোল্লস

জ্বল জ্বল প্রজ্জ্বল প্রজ্জ্বল সোঽহং হংসঃ স্বাহা ।। ৪ ।।

প্রাণায়ম

‘ওঁ’ বা গুরুপ্রদত্ত বীজমন্ত্রে (বাণেশ্বর শিবের ক্ষেত্রে ‘ঐঁ’ মন্ত্রে) চার বার ৪/১৬/৮ ক্রমে পূরক, কুম্ভক ও রেচক করে প্রাণায়ম করুন।

শ্রীগুর্বাদিপূজা

এরপর একটি একটি করে গন্ধপুষ্পদ্বারা শ্রীগুরু ও অন্যান্য দেবতাদের পূজা করুন। মন্ত্রগুলি হল—

ঐঁ এতে গন্ধপুষ্পে শ্রীগুরবে নমঃ।

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে গণেশাদিপঞ্চদেবতাভ্যো নমঃ।

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে আদিত্যাদিনবগ্রহেভ্যো নমঃ।

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে ইন্দ্রাদিদশদিকপালেভ্যো নমঃ।

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে কাল্যাদিদশমহাবিদ্যাভ্যো নমঃ।

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে মৎস্যাদিদশাবতারেভ্যো নমঃ।

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে মৎস্যাদিদশাবতারেভ্যো নমঃ।

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে সর্বেভ্যো দেবেভ্যো নমঃ।

ওঁ এতে গন্ধপুষ্পে সর্বাভ্যো দেবীভ্যো নমঃ।

ধ্যান

এরপর একটি ফুল নিয়ে (সম্ভব হলে কূর্মমুদ্রায় ফুলটি নেবেন) শিবের ধ্যান করবেন। শিবের সাধারণ ধ্যানমন্ত্র ও বাণেশ্বর ধ্যানমন্ত্র দুটি নিচে দেওয়া হল—

(সাধারণ ধ্যানমন্ত্র)—

ওঁ ধ্যায়েন্নিত্যং মহেশং রজতগিরিনিভং চারুচন্দ্রাবতংসং রত্নাকল্পোজ্জ্বলাঙ্গং পরশুমৃগবরাভীতিহস্তং প্রসন্নম্।

পদ্মাসীনং সমন্তাৎ স্তুতমমরগণৈর্ব্যাঘ্রকৃত্তিং বসানং বিশ্বাদ্যং বিশ্ববীজং নিখিলভয়হরং পঞ্চবক্ত্রং ত্রিনেত্রম্।।

(বাণেশ্বর শিবের ধ্যান)—

ঐঁ প্রমত্তং শক্তিসংযুক্তং বাণাখ্যঞ্চ মহাপ্রভাং।

কামবাণান্বিতং দেবং সংসারদহনক্ষমম্।।

শৃঙ্গারাদি-রসোল্লাসং বাণাখ্যং পরমেশ্বরম্।

এবং ধ্যাত্বা বাণলিঙ্গং যজেত্তং পরমং শিবম্।।

স্নান

এরপর শিবকে স্নান করাবেন। গঙ্গাজলে শুদ্ধজলে চন্দন মিশ্রিত করে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে শিবকে স্নান করাবেন এই মন্ত্রে শিবকে স্নান করাবেন—

ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।

উর্বারুকমিব বন্ধনান্মৃত্যোর্মুক্ষীয় মাঽমৃতাৎ।।

ওঁ  তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি

তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ ওঁ।

বিঃ দ্রঃ সাধারণ শিবলিঙ্গ ও বাণেশ্বর—উভয়ক্ষেত্রেই স্নান মন্ত্র এক।

প্রধান পূজা

স্নানের পর আরেকবার আগের ধ্যানমন্ত্রটি পাঠ করে শিবের ধ্যান করবেন। তারপর মনে মনে উপচারগুলি শিবকে উৎসর্গ করে মানসপূজা করবেন। মানসপূজার পর একে একে উপচারগুলি বাহ্যিকভাবে শিবকে সমর্পণ করবেন।

(সাধারণ শিবলিঙ্গে দশোপচার পূজার মন্ত্র)—

ওঁ নমো শিবায় এতৎ পাদ্যং শিবায় নমঃ। (সামান্যার্ঘ্য জল একটু দিন)

ওঁ নমো শিবায় এষঃ অর্ঘ্যঃ শিবায় নমঃ। (আতপচাল ও দূর্বা একটি সচন্দন বেলপাতায় করে ফুল সহ দিন)

ওঁ নমো শিবায় ইদমাচমনীয়ং শিবায় নমঃ। (সামান্যার্ঘ্য জল একটু দিন)

ওঁ নমো শিবায় ইদং স্নানীয়ং শিবায় নমঃ। (সামান্যার্ঘ্য জল একটু দিন)

ওঁ নমো শিবায় এষ গন্ধঃ শিবায় নমঃ। (চন্দনের ফোঁটা দিন)

ওঁ নমো শিবায় ইদং সচন্দনপুষ্পং শিবায় নমঃ। (একটি চন্দনমাখানো ফুল দিন)

ওঁ নমো শিবায় ইদং সচন্দনবিল্বপত্রং শিবায় নমঃ। (একটি চন্দনমাখানো বেলপাতা দিন)

ওঁ নমো শিবায় এষ ধূপঃ শিবায় নমঃ। (ধূপটি শিবের সামনে তিনবার ঘুরিয়ে দেবতার বাঁদিকে, অর্থাৎ নিজের ডানদিকে রাখুন)

ওঁ নমো শিবায় এষ দীপঃ শিবায় নমঃ। (প্রদীপটি শিবের সামনে তিনবার ঘুরিয়ে দেবতার ডানদিকে, অর্থাৎ নিজের বাঁদিকে রাখুন)

ওঁ নমো শিবায় ইদং সোপকরণনৈবেদ্যং শিবায় নিবেদয়ামি।

(নৈবেদ্যের উপর অল্প সামান্যার্ঘ্য জল ছিটিয়ে দিন)

ওঁ নমো শিবায় ইদং পানার্থোদকং শিবায় নমঃ।

(পানীয় জলের উপর অল্প সামান্যার্ঘ্য জল ছিটিয়ে দিন)

ওঁ নমো শিবায় ইদং পুনরাচমনীয়ং শিবায় নমঃ।

(সামান্যার্ঘ্য জল একটু দিন)

ওঁ নমো শিবায় ইদং তাম্বুলং শিবায় নমঃ। (একটি পান দিন, অভাবে সামান্যার্ঘ্য জল একটু দিন।)

ওঁ নমো শিবায় ইদং মাল্যং শিবায় নমঃ। (মালা থাকলে মালাটি পরিয়ে দিন)

(বাণেশ্বর শিবলিঙ্গে দশোপচার পূজার মন্ত্র)—

বিঃ দ্রঃ উপচার দেওয়ার নিয়ম সাধারণ শিবলিঙ্গে পূজার অনুরূপ।

ঐঁ এতৎ পাদ্যং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ এষঃ অর্ঘ্যঃ বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদমাচমনীয়ং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং স্নানীয়ং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ এষ গন্ধঃ বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং সচন্দনপুষ্পং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং সচন্দনবিল্বপত্রং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ এষ ধূপঃ বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ এষ দীপঃ বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং সোপকরণনৈবেদ্যং বাণেশ্বরশিবায় নিবেদয়ামি।

ঐঁ ইদং পানার্থোদকং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং পুনরাচমনীয়ং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং তাম্বুলং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং মাল্যং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

পুষ্পাঞ্জলি

সচন্দন পুষ্প ও বেলপাতা নিয়ে এই মন্ত্রে এক, তিন অথবা পাঁচ বার অঞ্জলি দেবেন—

(সাধারণ পুষ্পাঞ্জলি)—

ওঁ নমো শিবায় এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি নমো শিবায় নমঃ।

(বাণেশ্বর শিবের পুষ্পাঞ্জলি)—

ঐঁ এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

গৌরীপূজা

এইভাবে শিবপূজা শেষ করে শিবলিঙ্গের গৌরীপীঠ বা পিনেটে একটি ফুল দিয়ে এই মন্ত্রে গৌরীর পূজা করুন—

ওঁ হ্রীঁ এতে গন্ধপুষ্পে গৌর্যৈ নমঃ।

অষ্টমূর্তি পূজা

বাণেশ্বর শিবে অষ্টমূর্তির পূজা করতে হয় না। কিন্তু অন্যান্য শিবলিঙ্গের ক্ষেত্রে করতে হয়। একটি ফুল দিয়ে এই মন্ত্রে অষ্টমূর্তির পূজা করুন—

ওঁ  এতে গন্ধপুষ্পে অষ্টমূর্তিভ্যো নমঃ।

জপ ও জপসমর্পণ

এরপর ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ বা দীক্ষামন্ত্র ১০৮ বার জপ করে এই মন্ত্রে এক গণ্ডুষ জল শিবের নিচের দিকের ডান হাতের উদ্দেশ্যে প্রদান করুন—

ওঁ গুহ্যাতিগুহ্যগোপ্তা ত্বং গৃহাণাস্মৎকৃতং জপম্।

সিদ্ধির্ভবতু মে দেব ত্বৎপ্রসাদান্মহেশ্বর।।

প্রণাম

এইবার এই মন্ত্রটি পড়ে সাষ্টাঙ্গে শিবকে প্রণাম করে পূজা সমাপ্ত করুন—

(সাধারণ শিবলিঙ্গের ক্ষেত্রে)—

ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।

নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্তং পরমেশ্বরম্।।

(বাণেশ্বর শিবের ক্ষেত্রে)—

ওঁ বাণেশ্বরং নরকার্ণবতারণায়

জ্ঞানপ্রদায় করুণাময়সাগরায়।

কর্পূরকুন্দধবলেন্দুজটাধরায়

দারিদ্র্যদুঃখদহনায় নমঃ শিবায়।।

বিঃ দ্রঃ এটি সাধারণ নিয়ম। দীক্ষাগুরু বিশেষ নিয়ম কিছু বলে দিলে, সেই মতো পূজা করবেন। নতুবা এই নিয়মেই পূজা করা যেতে পারে।

—ইতি শিবপূজাপদ্ধতি সমাপ্ত—

 
4 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন নভেম্বর 19, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

ব্রাম স্টোকারের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে বঙ্গভারতীর বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য

আজ ৮ নভেম্বর, ২০১২। বিশিষ্ট ইংরেজ ভৌতিক সাহিত্য রচনাকার ব্রাম স্টোকারের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। গত বছর তাঁর “ড্রাকুলার অতিথি” গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ভূত চতুর্দশী উপলক্ষ্যে। সেই গল্পটি পরিমার্জিত পিডিএফ ই-বুকলেটের আকারে প্রকাশিত হল।

http://www.mediafire.com/view/?9o50ccy0mwgat20

 
4 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন নভেম্বর 8, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

রইল শনির দৃষ্টি

(এই রচনাটি পরশপাথর ই-পত্রিকায় ‘শনি-কথা’ নামে প্রকাশিত। এখানে সামান্য পরিমার্জনার পর পুনঃপ্রকাশিত হল।)

 

ভারতের জনপ্রিয় শিল্পকলায় শনিদেব।

৯-এ নবগ্রহ। আর নবগ্রহের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে সুপরিচিত গ্রহটি হল শনি ওরফে শনৈশ্চর। ‘শনির দৃষ্টি’বা ‘শনির দশা’ কথাটা রাজ্যের যত অশুভ ও অমঙ্গলের সমার্থক শব্দ; এমনই শনির কুখ্যাতি! যাঁর দৃষ্টিতে গণেশের মতো জাঁদরেল দেবতার মুন্ডু উড়ে যেতে পারে, তাঁর কাছে মানুষ তো কোন ছাড়! আর তাই স্বর্গপাড়ার এই মস্তান-দেবতাটিকে তুষ্ট করতে ভারতের পথে-ঘাটে-ফুটপাথে কিংবা প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে মন্দিরে প্রতি শনিবার বসে বারোয়ারি শনিপুজোর আসর; গ্রহবিপ্রেরা এই ‘মারণ’ দৃষ্টির কোপ থেকে মানুষকে বাঁচাতে দেন হরেক রকমের গ্রহশান্তির বিধান।

 

কিন্তু এই ভয়ংকর দেবতাটি সম্পর্কে আমরা জানি কতটুকুই বা? আসুন পুরাণের তালপাতার পুথি খুলে জেনে নিই আমাদের অতিপরিচিত শনিদেবকে ঘিরে দানা বাঁধা নানা গল্পকথা।

 

শনি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা যতই ভয়ভীতিমিশ্রিত হোক না কেন, মৎস্য পুরাণ কিন্তু শনিকে লোকহিতকর গ্রহের তালিকাতেই ফেলেছে। মৎস্য ও সৌর পুরাণের মতে, শনি বিবস্বান (সূর্য) ও ছায়ার পুত্র। আবার অগ্নি পুরাণের মতে, বিবস্বানের পত্নীর সংজ্ঞার গর্ভে শনির জন্ম। এদিকে মার্কণ্ডেয়, বায়ু, ব্রহ্মাণ্ড, বিষ্ণু ও কূর্ম পুরাণ মতে, শনি বা শনৈশ্চর অষ্টরুদ্রের প্রথম রুদ্রের পুত্র। তাঁর মায়ের নাম সুবর্চলা।

 

স্কন্দ পুরাণের আবন্ত্য খণ্ডে আছে, শনি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন শিপ্রা ও ক্ষাতা নদীর সংযোগস্থলে। উক্ত পুরাণেই শনির জন্ম নিয়ে একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনির অবতারণা করা হয়েছে: শনি জন্মগ্রহণ করেই ত্রিলোক আক্রমণ করে বসলেন এবং রোহিণীর পথ ভেদ করলেন। সারা ব্রহ্মাণ্ড শঙ্কিত হয়ে উঠল। ইন্দ্র প্রতিকার চাইতে ছুটলেন ব্রহ্মার কাছে। ব্রহ্মা সূর্যের কাছে গিয়ে শনিকে সংযত করতে বললেন। কিন্তু ততক্ষণে শনির দৃষ্টিপাতে সূর্যেরই পা-দুটি পুড়ে গিয়েছে। তিনি কিছুই করতে পারলেন না। তিনি ব্রহ্মাকেই উলটে শনিকে সংযত করার অনুরোধ করলেন। ব্রহ্মা গেলেন বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণুও নিজে কিছু করতে পারবেন না ভেবে ব্রহ্মাকে নিয়ে চললেন শিবের কাছে। শিব শনিকে ডেকে পাঠালেন। শনি বাধ্য ছেলের মতো মাথাটি নিচু করে এলেন শিবের কাছে। শিব শনিকে অত্যাচার করতে বারণ করলেন। তখন শনি শিবকে তাঁর জন্য খাদ্য, পানীয় ও বাসস্থানের নির্দেশ করতে বললেন। তখন শিবই ঠিক করে দিলেন—শনি মেষ ইত্যাদি রাশিতে তিরিশ মাস করে থেকে মানুষের পিছনে লাগবেন এবং এই করেই তাঁর হাড় জুড়াবে। অষ্টম, চতুর্থ, দ্বিতীয়, দ্বাদশ ও জন্মরাশিতে অবস্থান হলে তিনি সর্বদাই বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন হবেন। কিন্তু তৃতীয়, ষষ্ঠ বা একাদশ স্থানে এলে তিনি মানুষের ভাল করবেন এবং তখন মানুষও তাঁকে পূজা করবে। পঞ্চম বা নবম স্থানে এলে তিনি উদাসীন থাকবেন। এও ঠিক হল, অন্যান্য গ্রহদের তুলনায় তিনি বেশি পূজা ও শ্রেষ্ঠতম স্থান পাবেন। পৃথিবীতে স্থির গতির জন্য তাঁর নাম হবে স্থাবর। আর রাশিতে মন্দ গতির জন্য তাঁর নাম হবে শনৈশ্চর। তাঁর গায়ের রং হবে হাতি বা মহাদেবের গলার রঙের মতো। তাঁর চোখ থাকবে নিচের দিকে। সন্তুষ্ট হলে তিনি লোককে দেবেন রাজ্য, অসন্তুষ্ট হলে লোকের প্রাণ নেবেন। শনির দৃষ্টি যার দিকেই পড়বে, তিনি দেবতাই হোন, বা দৈত্য, মানব, উপদেবতাই হোন, পুড়ে মরতে হবেই হবে। এই কথা বলে শিব শনিকে মহাকালবনে বাস করতে বললেন।

 

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের গণেশের জন্মকাহিনির সঙ্গে শনির যোগের কথা অনেকেই জানেন। তবু সেটার উল্লেখ না করলে এই রচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উক্ত পুরাণ মতে, শনি আদৌ কুদৃষ্টি নিয়ে জন্মাননি; বরং স্ত্রীর অভিশাপই তাঁর কুদৃষ্টির কারণ। একদিন শনি ধ্যান করছিলেন, এমন সময় তাঁর স্ত্রী সুন্দর বেশভূষা করে এসে তাঁর কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করলেন। ধ্যানমগ্ন শনি কিন্তু স্ত্রীর দিকে ফিরেও চাইলেন না। অতৃপ্তকাম শনিপত্নী তখন শনিকে অভিশাপ দিলেন, “আমার দিকে ফিরেও চাইলে না তুমি! যাও, অভিশাপ দিলুম, এরপর থেকে যার দিকেই চাইবে, সে-ই ভষ্ম হয়ে যাবে।” এরপর ঘটনাচক্রে গণেশের জন্ম হল। সকল দেবদেবীর সঙ্গে শনিও গেলেন গণেশকে দেখতে। কিন্তু স্ত্রীর অভিশাপের কথা স্মরণ করে তিনি গণেশের মুখের দিকে তাকালেন না। পার্বতী শনির এই অদ্ভুত আচরণের কারণ জিজ্ঞাসা করলে শনি অভিশাপের বৃত্তান্ত খুলে বলেন। কিন্তু পার্বতী সেকথা বিশ্বাস করলেন না। তিনি শনিকে পীড়াপীড়ি করতে শুরু করলেন। বারংবার অনুরোধের পর শনি শুধু আড়চোখে একবার গণেশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাতেই গণেশের মুণ্ড দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

 

কৃত্তিবাসী রামায়ণে রাজা দশরথের সঙ্গে শনির সাক্ষাৎকারের একটি বর্ণনা আছে। কৃত্তিবাস এই কাহিনিটি আহরণ করেছেন স্কন্দ পুরাণের নাগর ও প্রভাস খণ্ড থেকে—তবে একটু অন্যভাবে। উক্ত পুরাণের মতে, অযোধ্যার জ্যোতিষীগণ দশরথকে সাবধান করে বলেছিলেন, শনিগ্রহ শীঘ্রই রোহিণী ভেদ করবেন। আর তার ফলে বারো বছর ধরে রাজ্যে ভীষণ অনাবৃষ্টি হবে। এই কথা শুনে ইন্দ্রের দেওয়া দিব্য রথে চড়ে দশরথ তৎক্ষণাৎ শনির পিছন ছুটলেন। সূর্য ও চন্দ্রের পথ অতিক্রম করে একেবারে নক্ষত্রমণ্ডলে গিয়ে শনির সামনে উপস্থিত হয়ে রাজা বললেন, “তুমি রোহিণীর পথ পরিত্যাগ কর। না করলে, আমি তোমাকে বধ করব।” শনি দশরথের এই রকম সাহস দেখে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি রাজার পরিচয় জানতে চাইলে দশরথ আত্মপরিচয় দিলেন। শুনে শনি বললেন, “আমি তোমার সাহস দেখে অত্যন্ত প্রীত হয়েছি। আমি যার দিকে তাকাই, সেই ভষ্ম হয়ে যায়। তবু তুমি প্রজাহিতের জন্য নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে আমার কাছে এসেছো, এতে আমি আরও বেশি খুশি হয়েছি। যাও, আমি কথা দিলাম, রোহিণীর পথ আমি আর কোনোদিনও ভেদ করব না।” কৃত্তিবাসী রামায়ণে আছে, অনাবৃষ্টি শুরু হওয়ার পর দশরথ শনির কাছে গিয়েছিলেন।

 

নিজের সন্তানকে ভক্ষণ করছেন স্যাটার্ন।

এবার চলে যাই দেশান্তরের পুরাণে। আমরা হিন্দুরা যে গ্রহটিকে শনি নামে চিহ্নিত করেছি, পাশ্চাত্য জগতে সেই গ্রহটির নাম স্যাটার্ন (Saturn)। রোমান দেবতা। তবে রোমান পুরাণের অন্যান্য দেবতাদের মতো ইনিও গ্রিক পুরাণ থেকে আমদানিকৃত। গ্রিক পুরাণে স্যাটার্নের নাম ক্রোনাস। স্যাটার্নের নাম অনুসারে স্যাটারডে, যেমন শনির নামে শনিবার। এছাড়া শনি ও ক্রোনাস/স্যাটার্নের মধ্যে মিল অল্পই। কালিকা পুরাণে শনির ধ্যানমন্ত্রে আছে—

ইন্দ্রনীলনিভঃ শূলী বরদো গৃধ্রবাহনঃ।

পাশবাণাসনধরো ধ্যাতব্যোঽর্কসুতঃ।।

অর্থাৎ, “নীলকান্তমণির মতো গাত্রবর্ণবিশিষ্ট; শূল, বরমুদ্রা, পাশ ও ধনুর্বাণধারী; শকুনিবাহন সূর্যপুত্র শনিকে ধ্যান করি।” মহানির্বাণ তন্ত্রে আরও এক ধাপ উঠে বলা হয়েছে, শনি হলেন কানা ও খোঁড়া। বলাবাহুল্য, এই চেহারার সঙ্গে ক্রোনাস/স্যাটার্নের চেহারার মিল আদৌ নেই। তাঁর হাতে থাকে কাস্তে। গ্রিক পুরাণে ক্রোনাস হলেন দেবরাজ জিউসের পিতা। তিনি ব্রহ্মাণ্ডপিতা ইউরেনাসের পুত্র। পিতাকে সিংহাসন থেকে উৎখাত করে তিনি ব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর হন। অত্যন্ত ক্ষমতালোভী ছিলেন। তাঁর ছেলেরা যাতে তাঁকে অনুসরণ করে সিংহাসনের দখল না নিতে পারে, সেজন্য তিনি নিজের ছেলেমেয়েদেরই ভক্ষণ করতেন। শেষে পুত্র জিউসের হাতে তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয় এবং তিনি কৃষিকর্মের দেবতা হয়ে থেকে যান। রোমান স্যাটার্নও কৃষিকাজ, মুক্তি ও সময়ের দেবতা। সেই হিসেবেও দেখা যায়, শনির মতো লোকপীড়নকারী চরিত্র এঁদের নয়।

 

সূর্যপুত্র শনি, বিজ্ঞানের আলোয়

শেষ পাতে, জ্যোতিষ থেকে চলে আসি জ্যোতির্বিজ্ঞানে। হিন্দুপুরাণের শনি যতই কুৎসিত এবং ক্ল্যাসিক্যাল পুরাণের স্যাটার্ন যতই নৃশংস হোন না কেন, আমাদের সৌরজগতের ষষ্ঠ গ্রহটি কিন্তু রূপে গুণে অসামান্য। তার কারণ, অবশ্যই এই গ্রহকে ঘিরে থাকা চাকতিগুলি; জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা বলি ‘শনির বলয়’। তুষারকণা, খুচরো পাথর আর ধূলিকণায় সৃষ্ট মোট নয়টি পূর্ণ ও তিনটি অর্ধবলয় শনিকে সর্বদা ঘিরে থাকে। শনি দৈত্যাকার গ্রহ; এর গড় ব্যাস পৃথিবীর তুলনায় নয় গুণ বড়ো। এর অভ্যন্তরভাগে আছে লোহা, নিকেল এবং সিলিকন ও অক্সিজেন মিশ্রিত পাথর। তার উপর যথাক্রমে একটি গভীর ধাতব হাইড্রোজেন স্তর, একটি তরল হাইড্রোজেন ও তরল হিলিয়াম স্তর এবং সবশেষে বাইরে একটি গ্যাসীয় স্তরের আস্তরণ। আমাদের শনিদেবের গায়ের রং নীলকান্তমণির মতো (শ্রদ্ধেয় হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে এই রং বিষ্ণুর থেকে ধার করা)। শনি গ্রহের রং কিন্তু হালকা হলুদ। এর কারণ শনির বায়ুমণ্ডলের উচ্চবর্তী স্তরে অবস্থিত অ্যামোনিয়া ক্রিস্টাল। শনির ধাতব হাইড্রোজেন স্তরে প্রবাহিত হয় এক ধরনের বিদ্যুত প্রবাহ। এই বিদ্যুৎ প্রবাহ থেকেই শনির গ্রহীয় চৌম্বক ক্ষেত্রের উদ্ভব ঘটেছে। এখনও পর্যন্ত শনির বাষট্টিটি চাঁদ আবিষ্কৃত হয়েছে এবং তার মধ্যে তিপ্পান্নটির সরকারিভাবে নামকরণ করা হয়েছে। অবশ্য এগুলি ছাড়াও শনির শতাধিক উপচাঁদ বা চন্দ্রাণু (Moonlets) আছে। সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপগ্রহ টাইটান শনির বৃহত্তম উপগ্রহ। এটি আকারে মঙ্গলের চেয়েও বড়ো এবং এটিই সৌরজগতের একমাত্র উপগ্রহ যার একটি সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল আছে।

 

 

 

 

 

 

ট্যাগ সমুহঃ ,

পুরাণের অজানা লক্ষ্মী-কাহিনি

‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা ও পাঁচালী’ নামক পাতলা চটি-বইটির দাপটে আমাদের এই বাংলায় লক্ষ্মী আপাদমস্তক লোকদেবী। লক্ষ্মীর বারব্রতই বলুন, কিংবা কোজাগরী বা দীপান্বিতা পূজাই বলুন, পৌরাণিক লক্ষ্মীর প্রবেশ যেন সেখানে আইন করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একথা ঠিক যে, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা প্রমুখ দেবদেবীদের দাপটে আমাদের পুরাণ শাস্ত্রগুলিকে লক্ষ্মী একটু ব্যাকফুটে চলে গিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে নিয়ে খুচরো গল্প পুরাণে কম ছড়িয়ে নেই। সমুদ্রমন্থনে লক্ষ্মীর উদ্ভবের গল্প অনেকের জানা। কিন্তু সেখানে লক্ষ্মী নীরব দর্শকমাত্র। সমুদ্র থেকে উঠেই নারায়ণের গলায় মালা দিয়ে বৈকুণ্ঠের গেরস্থালি সামলাতে শুরু করলেন। আর তারপরেই সেকালের পুরাণ শাস্ত্র থেকে আধুনিক হিন্দি সিরিয়ালে তাঁর কাজ হল নারায়ণের পা টিপে দেওয়া। সে গল্প বরং থাক। আসুন, লক্ষ্মীকে নিয়ে একটু অন্য ধরনের কয়েকটি গল্পের সন্ধান করা যাক।

উমার তপস্যা হিন্দু পুরাণের একটি জনপ্রিয় কাহিনি। সতী জন্মান্তরে হিমালয়ের ঘরে কন্যারূপে জন্ম নিয়ে শিবকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। স্কন্দপুরাণ থেকে জানা যায়, নারায়ণকে পেতে লক্ষ্মীও একই রকম তপস্যা করেছিলেন। ওই পুরাণের আবন্ত্য খণ্ডে আছে, লক্ষ্মী ঋষি ভৃগু ও তাঁর পত্নী খ্যাতির কন্যা। নরনারায়ণের বর্ণনা শুনে লক্ষ্মী তাঁর প্রেমে পড়ে যান। তাঁকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য সাগরসীমায় গিয়ে তপস্যা শুরু করেন। এক হাজার বছর কঠোর তপস্যার পর ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতারা নারায়ণের ছদ্মবেশে এসে তাঁকে বর চাইতে বলেন। লক্ষ্মী বিশ্বরূপ দেখতে চান। দেবতাদের ছলনা ধরা পড়ে যায়। তাঁরা লজ্জিত হয়ে ফিরে যান। এই খবর পেয়ে নারায়ণ নিজে আসেন লক্ষ্মীর কাছে। তিনি লক্ষ্মীকে বর দিতে চাইলে লক্ষ্মী বলেন, “আপনি যদি সত্যিই নারায়ণ হন, তবে বিশ্বরূপ দর্শন করিয়ে আমার বিশ্বাস উৎপাদন করুন।” নারায়ণ তা-ই করে লক্ষ্মীর সংশয় দূর করেন। তারপর নারায়ণ তাঁকে বলেন, “ব্রহ্মচর্যই সব ধর্মের মূল ও সর্বোত্তম তপস্যা। যেহেতু তুমি ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে এখানে তপস্যা করেছো, সেহেতু আমিও ‘মূল শ্রীপতি’ নামে এখানে অবস্থান করব এবং তুমিও এখানে ব্রহ্মচর্য-স্বরূপা ‘ব্রাহ্মী মূলশ্রী’ নামে পরিচিত হবে।”

একটি আশ্চর্য লক্ষ্মী-উপাখ্যান পাওয়া যায় অদ্ভুত রামায়ণে। লক্ষ্মী একবার তাঁর সখীদের নিয়ে কৌশিক নামে এক বিষ্ণুভক্ত ব্রাহ্মণের বাড়ি গান শুনতে গিয়েছিলেন। সেখানে ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবতারাও গিয়েছিলেন গান শুনতে। কিন্তু তাঁরা যেতেই লক্ষ্মীর সহচরীরা তর্জন গর্জন করে তাঁদের দূরে সরে যেতে বলেন। দেবতারা লক্ষ্মীকে খুব সম্মান করতেন। তাঁরা কিছু না বলে সরে যান। শুধু নারদ এতে অপমান বোধ করেন। তিনি বুঝতে পারেন, লক্ষ্মীর সহচরীরা লক্ষ্মীর জ্ঞাতসারেই এই কাজ করেছে। তাই তিনি লক্ষ্মী-সহ সবাইকে রাক্ষসযোনিতে জন্মগ্রহণের অভিশাপ দেন। শাপের বর্ণনা শুনে লক্ষ্মী নারদের কাছে এক আশ্চর্য প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, যে রাক্ষসী স্বেচ্ছায় ঋষিদের রক্ত অল্প অল্প করে সঞ্চয় করে কলস পূর্ণ করবে, তিনি যেন তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। নারদ সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।

দেবীভাগবত পুরাণেও লক্ষ্মীকে নিয়ে এক আশ্চর্য কাহিনির সন্ধান মেলে। সূর্যের ছেলে রেবন্ত কোনো এক সময় উচ্চৈঃশ্রবা নামক ঘোড়ায় চড়ে বৈকুণ্ঠে বেড়াতে এসেছিলেন। উচ্চৈঃশ্রবা একে অশ্বরাজ, তায় লক্ষ্মীর মতোই সমুদ্রমন্থনের সময় উদ্ভুত। ঘোড়াটিকে লক্ষ্মী নিজের ভাইয়ের মতো দেখতেন। তাই উচ্চৈঃশ্রবা বৈকুণ্ঠে আসতেই তিনি স্বামীকে ছেড়ে ঘোড়ার আদরযত্ন নিয়ে পড়লেন। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা রেবন্তকে দেখে অবাক হলেন নারায়ণও। তিনি লক্ষ্মীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এই ছেলেটি কে?” লক্ষ্মী তখন ঘোড়ার আপ্যায়নে ব্যস্ত। কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেও কথার উত্তর না পেয়ে লক্ষ্মীর উপর বেজায় খাপ্পা হয়ে উঠলেন নারায়ণ। স্ত্রীকে অভিশাপ দিয়ে বসলেন, “ঘোড়া নিয়ে এত আদিখ্যেতা যখন, তখন মর্ত্যে মাদীঘোড়া হয়ে জন্মাও গে!” যতই হোক, নারায়ণ লক্ষ্মীর স্বামী; লক্ষ্মীও নারায়ণের স্ত্রী। অভিশাপ শুনে লক্ষ্মীর খুব কষ্ট হল। নারায়ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে তিনি শাপমুক্ত হয়ে আবার বৈকুণ্ঠে ফিরতে পারবেন। নারায়ণ বললেন, মর্ত্যে গিয়ে লক্ষ্মীর নারায়ণ-তুল্য এক ছেলে হবে। তারপরই লক্ষ্মী বৈকুণ্ঠে ফিরতে পারবেন। এরপর যথারীতি মর্ত্যে মাদী ঘোড়া হয়ে জন্মালেন লক্ষ্মী। মর্ত্যে গিয়ে তিনি শিবের তপস্যা করলেন। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শিব বর দিতে এলে লক্ষ্মী বললেন, তাঁর সন্তান যেন নারায়ণের ঔরসেই জন্মায়। শিবের পরামর্শে নারায়ণ হয়গ্রীব অবতার গ্রহণ করে ঘোটকীরূপিণী লক্ষ্মীকে বিয়ে করলেন। তাঁদের ছেলে হলে লক্ষ্মী শাপমুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠে ফিরে গেলেন।

এই দেবীভাগবত পুরাণেই লক্ষ্মীর চরিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে—তিনি পতিব্রতাদের মধ্যে প্রধান, সকল জীবের জীবন, স্বর্গে স্বর্গলক্ষ্মী, রাজগৃহে রাজলক্ষ্মী ও সাধারণ মর্ত্যবাসীর ঘরে গৃহলক্ষ্মী। তিনি বণিকদের কাছে বাণিজ্যলক্ষ্মী। আবার পাপীদের কলহ উৎপাদিনী। আমাদের বাংলার লক্ষ্মী ব্রতকথাগুলি পুরাণকথাকে আশ্রয় না করলেও, সেই সব উপকথার সারবস্তুর সঙ্গে এই পৌরাণিক বর্ণনার কী আশ্চর্য মিল দেখা যায়!

 

ট্যাগ সমুহঃ ,