RSS

Monthly Archives: সেপ্টেম্বর 2012

হেনরি জেমস (১৮৪৩-১৯১৬)

জীবন

তরুণ হেনরি জেমস

হেনরি জেমসের জন্ম নিউ ইয়র্কের এক ধনী ও সম্ভ্রান্ত আমেরিকান পরিবারে। শিক্ষা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। পরে ১৮৬২ সালে তিনি আইন পড়ার জন্য যোগ দেন হার্ভার্ডে। নিউ ইংল্যান্ড লেখকগোষ্ঠীর সদস্য জেমস রাসেল লোয়েল, এইচ. ডাবলিউ. লংফেলো, উইলিয়াম ডিন প্রমুখ ছিলেন তাঁর বন্ধুস্থানীয়। হাওয়েলের অ্যাটলান্টিক মান্থলি ও অন্যান্য কয়েকটি মার্কিন পত্রিকায় লেখালিখি করতে গিয়ে জেমসের সাহিত্যজীবনের সূত্রপাত হয়। ১৮৬০-এর দশকের শেষদিক থেকে পুরনো ইউরোপীয় সভ্যতা তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করতে শুরু করে। এই সময় ইউরোপে তিনি দীর্ঘদিন কাটান। শেষে ১৮৭৫ সালে পাকাপাকিভাবে চলে আসেন লন্ডনে। ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত জেমস লন্ডনেই ছিলেন। তারপর তিনি চলে যান রাইতে। সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটেনের নাগরিকত্ব লাভ করেছিলেন।

সাহিত্য

জেমস ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাধর লেখক। উপন্যাস, ছোটোগল্প, ভ্রমণকাহিনি, সাহিত্য সমালোচনা, আত্মজীবনী—সব কিছুই সারাজীবন ধরে নিয়মিত লিখে গিয়েছেন। তাঁর প্রধান উপন্যাসগুলিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। রোডেরিক হাডসন (১৮৭৫) থেকে শুরু করে যে চারটি উপন্যাস আমরা পাই, সেগুলি তাঁর পরিণত উপন্যাসগুলির তুলনায় অনেক সরল সাদাসিধে পদ্ধতিতে লেখা। এগুলির মধ্যে তিনি ধরেছেন পুরনো ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও নব্য আমেরিকান সভ্যতার পার্থক্যের দিকটিকে। এই শ্রেণির অপর তিনটি উপন্যাসের নাম দ্য আমেরিকান (১৮৭৬-৭৭), দ্য ইউরোপিয়ানস (১৮৭৮) ও দ্য পোর্ট্রেট অফ আ লেডি (১৮৮১)। শেষোক্ত উপন্যাসটিকে তাঁর প্রথম জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা বলা চলে। এই উপন্যাসের সূক্ষ্ম চরিত্র বিশ্লেষণ ও সযত্ন রচনাশৈলী জেমসকে তাঁর সাহিত্যজীবনের পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। এরপর যে তিনটি উপন্যাস তিনি লেখেন, সেগুলি মূলত তাঁর ইংরেজ-চরিত্র অধ্যয়নের ফল। এগুলি হল: দ্য ট্র্যাজিক মিউজ (১৮৯০), দ্য স্পয়েলস অফ পয়েন্টন (১৮৯৭) ও দ্য অকার্ড এজ (১৮৯৯)। এগুলির মধ্যে দ্য স্পয়েলস অফ পয়েন্টন উপন্যাসটি তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্রাকার। এই উপন্যাসটি জেমসের রচনাশৈলীর বিবর্তনের অন্যতম প্রধান সাক্ষী। সাহিত্যজীবনের মধ্যগগনে তিনি রচনা করেন তিনটি উপন্যাস—দ্য উইংস অফ দ্য ডোভ (১৯০২), দ্য অ্যাম্বাস্যাডারস (১৯০৩) ও দ্য গোল্ডেন বাওল (১৯০৪)। এই তিন উপন্যাসে তিনি আবার ফিরে আসেন ইউরোপীয় ও আমেরিকান সংস্কৃতির বিরোধের জায়গাটিতে। তবে এখানে চরিত্রচিত্রণে তিনি অনেক সূক্ষ্ম এবং শিল্পসৃজনে এক দক্ষ রূপকার। তাই আধুনিক উপন্যাসের সারিতে এগুলির নাম উঠে আসে সবার আগে। তবে এই উপন্যাসগুলি রসাস্বাদনের জন্য পাঠকের গভীর মনোযোগ ও সচেতনতা দাবি করেছিল। তাই এগুলি কখনই খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। আমেরিকান জীবনধারা অধ্যয়ন করে জেমস দুটি অসামান্য বই লিখেছিলেন—ওয়াশিংটন স্কোয়ার (১৮৮১) ও দ্য বস্টনিয়ানস (১৮৮৬)। আরও দুটি বই তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯১৭ সালে দ্য সেন্স অফ দ্য পাস্টদ্য আইভরি টাওয়ার নামে প্রকাশিত হয় বইদুটি।

ছোটোগল্পেও হেনরি জেমস ছিলেন মুকুটহীন সম্রাট। তিনি প্রায় একশোটি ছোটোগল্প লিখেছিলেন, যার সূচনা হয়েছিল আমেরিকান পত্রপত্রিকার চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে। জীবনের মধ্যভাগ পর্যন্ত ছোটোগল্প লিখেছেন তিনি। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প-সংকলন সম্ভবত দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রিউ (১৮৯৮)। কিন্তু অতিপ্রাকৃতের প্রতি তাঁর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি পরিস্ফুট হয় দ্য অল্টার অফ দ্য ডেড, দ্য বিস্ট ইন দ্য জাঙ্গল, দ্য বার্থ প্লেস, অ্যান্ড আদার টেলস (১৯০৯) গল্প-সংকলনে। অন্যান্য গল্পগুলি সংকলিত হয়েছে দ্য ম্যাডোনা অফ দ্য ফিউচার অ্যান্ড আদার টেলস (১৮৭৯), দ্য অ্যাসপার্ন পেপারস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ (১৮৮৮), টারমিনেশনস (১৮৯৫) ও দ্য টু ম্যাজিকস (১৮৯৮) সংকলনগুলিতে।

তাঁর আত্মজৈবনিক রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য— আ স্মল বয় অ্যান্ড আদারস (১৯১৩), নোটস অফ আ সন অ্যান্ড ব্রাদার (১৯১৪), এবং মরণোত্তর প্রকাশিত খণ্ড-রচনা টারমিনেশনস (১৯১৭)। (উল্লেখ্য, টারমিনেশন নামে জেমসের একটি গল্প-সংকলনও আছে, সেটি আলাদা বই।) ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় জেমসের পত্র সংকলন। এছাড়া নোটস অন নভেলিস্টস (১৯১৪), এবং প্রবন্ধ দ্য আর্ট অফ ফিকশন (১৮৮৪) তাঁর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত দ্য নোটবুক অফ হেনরি জেমস লেখককে জানার এক অতীত প্রয়োজনীয় বই।

দর্শন

হেনরি জেমস আধুনিক ঔপন্যাসিকদের মধ্যে প্রথম প্রজন্মের ব্যক্তিত্ব। তাঁর উপন্যাস এবং ভার্জিনিয়া উলফ, ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ড, কনরাড প্রমুখের উপন্যাসের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে ঐক্য দেখা যায়। উপন্যাস রচনা ছিল জেমসের দৃষ্টিতে এক শিল্প। তিনি উপন্যাসকে তাই বিচার করতেন শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে, নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। এই জন্যই নিজের উপন্যাসে উদ্দেশ্য ও বাস্তব জীবনের নিরপেক্ষ উপস্থাপনাকে তিনি অতিনাটকীয় রোম্যান্স বা ভাবপ্রবণতার আধিক্যের চেয়ে উচ্চ স্থানে বসিয়েছিলেন। বাইরের ঘটনার তুলনায় মানবমনের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন তার উপন্যাসের কেন্দ্রস্থলে থাকত।

 
2 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন সেপ্টেম্বর 21, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

পূজারম্ভের পূর্বে আচমন কেন ও কিভাবে করে?

আচমন প্রসঙ্গে পূজ্যপাদ স্বামী প্রমেয়ানন্দজি মহারাজ লিখেছেন, “দেহ-মন শুদ্ধ না থাকলে আধ্যাত্মিক সাধনের যোগ্যতা হয় না। অন্যভাবে, দেহ-মন শুদ্ধ করে নিয়ে তবে সাধন-ভজনে প্রবৃত্ত হতে হয়। আচমনের মুখ্য উদ্দেশ্য দেহ-মন শুদ্ধ করা। বিষ্ণুস্মরণ দেহ-মনশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়।… আবার আচমন পূজককে পূজার লক্ষ্য সর্বব্যাপক অখণ্ড-চৈতন্য পরমাত্মার দিকে অগ্রসর হওয়ার কথাও পরোক্ষভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।” (পূজাবিজ্ঞান, পৃ. ১৯) এই কারণে হিন্দুরা যে কোনো পবিত্র কাজ, তা সে পূজাই হোক বা অন্য কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানই হোক, তা শুরু করার আগে আচমন করে থাকেন।

আচমনের দুটি অংশ। প্রথমটি মূল আচমন প্রক্রিয়া, দ্বিতীয়টি তার আনুষঙ্গিক বিষ্ণুস্মরণ। আচমন প্রক্রিয়াটি ওঁ-কারযুক্ত শুদ্ধ বিষ্ণুনাম উচ্চারণ-সহ কয়েকটি প্রতীকী ক্রিয়া। বিষ্ণুস্মরণের সময় আমরা সাধারণত যে মন্ত্রটি উচ্চারণ করি, সেটি হল—

ওঁ   তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্। ১

ওঁ   অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।

যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।। ২

মন্ত্রটির বাংলা অর্থ—

আকাশের সূর্যের মতো সর্বত্র প্রকাশমান, বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্রে প্রসিদ্ধ, পরম তত্ত্ব জ্ঞানীগণ সর্বদা দর্শন করেন। ১

বাহ্য শরীর ও শরীরের অভ্যন্তরে স্থিত মনের কোনো একটি বা দুটিই যদি অপবিত্র হয়, তবে পদ্মলোচন শ্রীবিষ্ণুকে স্মরণ করা মাত্রই বাহ্য ও অন্তরে শুদ্ধ হওয়া যায়। ২

মন্ত্রের তাৎপর্য উল্লেখ করে প্রমেয়ানন্দজি উপসংহারে লিখেছেন, “কর্মের (পূজা) সূচনায় সাধকও প্রার্থনা করছেন—জ্ঞাননেত্রে তিনি যেন বিষ্ণুকে দর্শন করতে পারেন, তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন ; কর্মের উদ্দেশ্য সাধনে তিনি যেন সক্ষম হন।” (তদেব)

কেউ কেউ বিষ্ণুস্মরণ মন্ত্রের সঙ্গে আরও দুটি পংক্তি জুড়ে দেন—

ওঁ   মাধবো মাধবো বাচি মাধবো মাধবো হৃদি।

স্মরন্তি সাধবঃ সর্বে সর্বকার্যেষু মাধব।।

মন্ত্রের অর্থ—

সাধুব্যক্তিদের বাক্যে মাধব (বিষ্ণু) ও হৃদয়ে মাধব। তাঁরা সকল কাজেই মাধবকে স্মরণ করে থাকেন।

আচমন পদ্ধতি

ডান হাতের তালু ‘গোকর্ণাকৃতি’ অর্থাৎ গোরুর কানের মতো করে একটি মাষকলাই ডুবতে পারে, এই পরিমাণ জল নিয়ে ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রে পান করতে হবে। এই রকমভাবে তিন বার জল পান করতে হয়। তারপর বুড়ো আঙুলের পিছন দিকটি দিয়ে ওষ্ঠ ও অধর ডান দিক থেকে বাঁদিকে দুবার মার্জনা করে সামান্য জলে হাত ধুয়ে নিতে হয়। এরপর ডান হাতের নির্দিষ্ট আঙুলের ডগা দিয়ে নিম্নলিখিত ক্রমে নির্দিষ্ট স্থানগুলি স্পর্শ করা হয়—

(১) তর্জনী+মধ্যমা+অনামিকা (একসঙ্গে)—ওষ্ঠ ও অধর।

(২) (হাত ধুতে হবে)
(৩) বুড়ো আঙুল+তর্জনী—ডান ও বাঁ নাক।

(৪) বুড়ো আঙুল+অনামিকা—ডান ও বাঁ চোখ; ডান ও বাঁ কান।

(৫) বুড়ো আঙুল+কড়ে আঙুল—নাভি

(৬) (আবার হাত ধুতে হবে)

(৭) করতল দ্বারা হৃদয় স্পর্শ করতে হবে

(৮) সবকটি আঙুলের ডগা দিয়ে মাথা, ডান ও বাঁ বাহুমূল স্পর্শ করতে হবে।

(দ্রঃ এই ক্রিয়াগুলি অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই করে থাকেন। এগুলি যাঁরা করতে অসমর্থ তাঁরা শুধু ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রে জলপান করেই আচমন করেন।)

এরপর হাতজোড় করে পূর্বোক্ত আচমন মন্ত্রটি পাঠ করতে হয়—

ওঁ   তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্।

ওঁ   অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।

যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।।

মন্ত্রপাঠের সময় মনে মনে শ্রীবিষ্ণুকে স্মরণ করাও আবশ্যক। কারণ, মনে রাখতে হবে সংস্কৃত আমাদের মাতৃভাষা নয়, তাই সংস্কৃত মন্ত্র শুধু পাঠ করেই আমরা তার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারি না, সেজন্য আমাদের মন্ত্রের অর্থ বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়।

নিত্যপূজায় উপরিউক্ত ক্রমেই আচমন করে। তবে বিশেষ পূজায় আচমনের পর কুশাঙ্গুরীয় ধারণ করে পাপস্খালনের জন্য নিম্নোক্ত মন্ত্রটিও পাঠ করতে হয়—

ওঁ   দেব তৎ প্রাকৃতং চিত্তং পাপাক্রান্তমভূন্মম।

তন্নিঃসারয় চিত্তান্মে পাপং হূঁ ফট চ তে নমঃ।

ওঁ   সূর্য সোমো যমঃ কালো মহাভূতানি পঞ্চ চ।

এতে শুভাশুভস্যেহ কর্মণো নব সাক্ষিণঃ।।

 
4 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন সেপ্টেম্বর 18, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষার ইতিহাস

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকার ও পরে ব্রিটিশ রাজ সরকার ভারতবাসীর শিক্ষার মানোন্নয়নের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। তাঁদের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল কম-মাইনেতে ইংরেজি-শিক্ষিত কেরানির দল তৈরি করা।

১৭৮১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতা মাদ্রাসা (অধুনা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) চালু করেন। ১৭৯১ সালে জোনাথান ডানকান বারাণসীতে একটি সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেসলি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা ও আদবকায়দা শেখানোর উদ্দেশ্য নিয়ে কলকাতায় চালু করেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।

১৮১৩ সালের চার্টার আইনে ভারতে শিক্ষাবিস্তারে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দায়িত্বের কথা প্রথম স্বীকার করা হয়। এই আইন মোতাবেক, ভারতীয়দের শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য বার্ষিক এক লক্ষ টাকা ধার্য করা হয়। এরপর ১৮১৭ সালে ডেভিড হিউম কলকাতা হিন্দু কলেজ (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) স্থাপন করেন।

১৮৩৫ সালে ইংরেজি ভাষাকে ভারতের উচ্চশিক্ষার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘উড’স ডেসপ্যাচ অন এডুকেশন’। চার্লস উডের এই ‘ডেসপ্যাচ’কেই ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা আখ্যা দেওয়া হয়। তিনিই প্রথম প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত শিক্ষার একটি যুক্তিসঙ্গত পাঠক্রম নথি আকারে প্রকাশ করেন। এই নথিতে প্রাথমিক স্তরে, মাধ্যমিক স্তরে এবং উচ্চশিক্ষা স্তরে কিভাবে কি পড়ানো হয়ে তার বিভাগ করে দেন তিনি। উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ইংরেজি এবং প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্থানীয় ভাষাকে গ্রহণ করা হয়। দেশীয় ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইঙ্গ-দেশীয় ভাষা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও অনুমোদিত কলেজগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি সরকারি অনুদান পেতে শুরু করে। নারীশিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে ঘরোয়া পরিবেশে মেয়েদের শিক্ষা দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। শিক্ষক-প্রশিক্ষণের জন্যও উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বও স্বীকৃতি পায়। ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়।

হান্টার কমিশন ১৮৮২-৮৩

ওয়ার্ডসের আবেদনের ভিত্তিতে লর্ড রিপন ভারত সরকারের শিক্ষানীতি পুনরালোচনার জন্য এক সদস্যের হান্টার কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন জানায়, প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষা, সাক্ষরতা ও বাণিজ্য শিক্ষার বিস্তারেও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হান্টার কমিশন। শুধু তাই নয়, হান্টার নারীশিক্ষা বিস্তার ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপের জন্যও সুপারিশ করেছিলেন। এরপর ১৮৮২ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৮৮৭ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়।

ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯০৪

লর্ড কার্জনের আমলে ১৯০৪ সালের ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস ও কার্যকর হয়। ১৯০১ সালে সিমলা শিক্ষা সম্মেলনের পর লর্ড কার্জন শিক্ষাক্ষেত্রে স্যার টমাস র্যালে কমিশন গঠন করেন। এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এই আইন পাস হয়। উক্ত কমিশনে একজন ভারতীয় সদস্যও ছিলেন। তিনি গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। এই আইন চালু হওয়ার পর সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলোদের মনোনীত করার অধিকার পায়। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ব্যাপারে সরকারের ভেটো প্রয়োগের অধিকারও স্বীকৃত হয়। বেসরকারি কলেজগুলির উপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃত্ব শুরু হয়। ফেলোদের সদস্যসংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্তিয়ার-এলাকা ও অনুমোদিত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে বাঁটোয়ারা করে দেওয়ার জন্য গভর্নর-জেনারেল-ইন-কাউন্সিলকে ক্ষমতা দেওয়া হয়।

স্যাডলার কমিশন, ১৯১৭-১৯

১৯০৬ সালে দেশীয় রাজ্য বরোদায় রাজার আদেশ বলে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়। ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্ম পর্যালোচনার জন্য গঠিত হয় স্যাডলার কমিশন। এই কমিশনের দুজন ভারতীয় সদস্য ছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ। ১৯১৯ সালে স্যাডলার কমিশন উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রস্তাব রাখেন। স্যাডলার কমিশন সুপারিশ করেন, ইন্টারমিডিয়েটের পর ৩ বছরের ডিগ্রি কোর্স রাখা উচিত, নারীশিক্ষায় আরও গুরুত্ব আরোপ করা উচিত, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের সুযোগ আরও বৃদ্ধি করা উচিত, এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নিজস্ব ক্যাম্পাস থাকা উচিত এবং আবাসিক ও বোর্ডিং সুবিধাযুক্ত হওয়া উচিত।

হার্টোগ কমিশন, ১৯২৯

হার্টোগ কমিশন জাতীয় স্তরে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বের কথা বলে। এই কমিশন তহবিল সঞ্চয় ও উন্নয়ন নীতির উপর জোর দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়ার কথাও বলা হয়।

বুনিয়াদি শিক্ষাক্ষেত্রে ওয়ার্ধা পরিকল্পনা, ১৯৩৭

১৯৩৭ সালে মহাত্মা গান্ধী হরিজন পত্রিকায় একগুচ্ছ নিবন্ধ প্রকাশ করে শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বিশেষ পরিকল্পনার প্রস্তাব দেন। এই পরিকল্পনা বুনিয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা বা ওয়ার্ধা স্কিম নামে পরিচিত। এই পরিকল্পনার মূল কথা ছিল কাজের মাধ্যমে শিক্ষা। জাকির হুসেন কমিটি এই পরিকল্পনার খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ করেন এবং কয়েকটি কোর্সের জন্য পাঠক্রম তৈরি করেন। শুধু তাই নয়, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ, পর্যালোচনা, পরীক্ষা ও শিক্ষাপ্রশাসন পরিচালনা সংক্রান্ত একগুচ্ছ প্রস্তাবও দেন।

সারজেন্ট পরিকল্পনা, ১৯৪৪

এই পরিকল্পনা ভারতে বুনিয়াদি শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের উপর জোর দেয় এবং ৬-১১ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য সর্বজনীন অবৈতনিক শিক্ষাদানের কথা বলে। এই পরিকল্পনায় ৬ বছরের বিদ্যালয় পাঠক্রমের সুপারিশ করা হয়। উচ্চ বিদ্যালয়গুলিকে (১) আকাদেমিক ও কারিগরি ও (২) ভোকেশনাল—এই দুই ভাগে ভাগ করার কথা বলা হয়। এই পরিকল্পনাতেই ইন্টারমিডিয়েট স্তর অবলুপ্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়। সারজেন্ট পরিকল্পনায় ৪০-বছরের শিক্ষা-সংস্কার পরিকল্পনার উপর জোর দেওয়া হয়। পরে খের কমিটি এই সংস্কার পরিকল্পনার সময়কাল কমিয়ে ১৬ বছর করে।

 
3 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন সেপ্টেম্বর 17, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

ই-বই: ইতিহাসের আগের ভারত

বঙ্গভারতী ব্লগে পূর্বপ্রকাশিত “প্রাগৈতিহাসিক ভারত” ও “সিন্ধুসভ্যতা” নিবন্ধদুটি নতুন আকারে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল।

পিডিএফ আকারে বইটি ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন:
http://www.mediafire.com/?23s61tbvx25cq3p

 

ট্যাগ সমুহঃ

জ্যোতির্বিজ্ঞানের তেরোটি বিশ্বকাঁপানো আবিষ্কার

গ্রহের গতি (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-৫০০ অব্দ)

প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এক হাজার বছরের পর্যবেক্ষণের ফলে জানা যায়, আকাশের তারাগুলির মধ্যে কয়েকটি নিজস্ব গতি আছে। এইগুলি এবং আমাদের পৃথিবী গ্রহ তারামণ্ডল থেকে পৃথক এক সৌরজগতের সদস্য।

 

কোপারনিকাস ও তাঁর সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের মডেল

পৃথিবীর গতি (১৫৪৩)

আগেকার মানুষের ধারণা ছিল, সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে পৃথিবী এবং তাকে কেন্দ্র করেই যাবতীয় গ্রহনক্ষত্র আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু নিকোলাস কোপারনিকাস এই ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটিয়ে জানান যে, সৌরজগতের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে সূর্য। তাকে কেন্দ্র করেই পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলি ঘুরছে।

 

গ্রহগুলির উপবৃত্তাকার কক্ষপথ

গ্রহগুলির কক্ষপথ উপবৃত্তাকার (১৬০৫-১৬০৯)

গ্রহগুলির কক্ষপথ যে উপবৃত্তাকার তা গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে প্রথম যথাযথভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হন জোনান কেপলার।

Read the rest of this entry »

 

ট্যাগ সমুহঃ

বঙ্গভারতী পূজাপদ্ধতি গ্রন্থমালা-১: বৃহস্পতিবারবিহিত শ্রীশ্রীলক্ষ্মীপূজাপদ্ধতি (ব্রতকথা ও অন্যান্য জ্ঞাতব্য বিষয় সহ)

বাজারে ‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা ও পাঁচালি’ নামাঙ্কিত অনেক বইই সুলভ। কিন্তু সেই সব অধিকাংশ বইই ত্রুটিপূর্ণ। তাছাড়া সাধারণ গৃহস্থ ভক্তের উপযোগী পূজাপদ্ধতি কোনো বইতেই দেওয়া থাকে না। সেই কথা মাথায় রেখে একটি পরিমার্জিত ব্রতকথা-সহ পূজাপদ্ধতির প্রকাশ আবশ্যক ছিল। এই পূজাপদ্ধতির একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এখানে মন্ত্রগুলির বাংলা অর্থ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রের অর্থজ্ঞান ছাড়া পূজা সম্পূর্ণ হয় না। আর যাঁরা দুরূহ সংস্কৃত ভাষা পাঠে অক্ষম হবেন, তাঁরা বাংলায় মন্ত্রার্থ দেখে মূল কথাটি আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে জগজ্জননীকে নিবেদন করতে পারবেন। লক্ষ্মীদেবীর একটি অতি-সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও গ্রন্থাগ্রে সংযোজন করে দেওয়া হল। এতে লক্ষ্মীপূজা আমরা কেন করব, সেই সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা জন্মাবে। ব্রতকথা ও বারোমাস্যা বাজারে প্রচলিত বারোমাস্যারই একটি সংশোধিত রূপ।

বইটি পেতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন।
http://www.mediafire.com/?muj3j3g77mrve5q

 
১ টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন সেপ্টেম্বর 5, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর বৃহস্পতিবারবিহিত ব্রতকথা-পাঁচালি ও বারমাস্যা

শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা-পাঁচালি

দোলপূর্ণিমা নিশীথে নির্মল আকাশ।

মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস।।

লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ।

কহিতেছে নানা কথা সুখে আলাপন।।

হেনকালে বীণাযন্ত্রে হরি গুণগান।

উপনীত হইলেন নারদ ধীমান।।

ধীরে ধীরে উভপদে করিয়া প্রণতি।

অতঃপর কহিলেন লক্ষ্মীদেবী প্রতি।।

শুন গো, মা নারায়ণি, চলো মর্ত্যপুরে।

তব আচরণে দুখ পাইনু অন্তরে।।

তব কৃপা বঞ্চিত হইয়া নরনারী।

ভুঞ্জিছে দুর্গতি কত বর্ণিবারে নারি।।

সতত কুকর্মে রত রহিয়া তাহারা।

দুর্ভিক্ষ অকালমৃত্যু রোগে শোকে সারা।।

অন্নাভাবে শীর্ণকায় রোগে মৃতপ্রায়।

আত্মহত্যা কেহ বা করিছে ঠেকে দায়।।

কেহ কেহ প্রাণাধিক পুত্রকন্যা সবে।

বেচে খায় হায় হায় অন্নের অভাবে।।

অন্নপূর্ণা অন্নরূপা ত্রিলোকজননী।

বল দেবি, তবু কেন হাহাকার শুনি।।

কেন লোকে লক্ষ্মীহীন সম্পদ অভাবে।

কেন লোকে লক্ষ্মীছাড়া কুকর্ম প্রভাবে।।

শুনিয়া নারদবাক্য লক্ষ্মী ঠাকুরানি।

সঘনে নিঃশ্বাস ত্যজি কহে মৃদুবাণী।।

সত্য বাছা, ইহা বড় দুঃখের বিষয়।

কারণ ইহার যাহা শোনো সমুদয়।।

আমি লক্ষ্মী কারো তরে নাহি করি রোষ।

মর্ত্যবাসী কষ্ট পায় ভুঞ্জি কর্মদোষ।।

মজাইলে অনাচারে সমস্ত সংসার।

কেমনে থাকিব আমি বল নির্বিকার।।

কামক্রোধ লোভ মোহ মদ অহংকার।

আলস্য কলহ মিথ্যা ঘিরিছে সংসার।।

তাহাতে হইয়া আমি ঘোর জ্বালাতন।

হয়েছি চঞ্চলা তাই ওহে বাছাধন।।

পরিপূর্ণ হিংসা দ্বেষ তাদের হৃদয়।

পরশ্রী হেরিয়া চিত্ত কলুষিত ময়।।

রসনার তৃপ্তি হেতু অখাদ্য ভক্ষণ।

ফল তার হের ঋষি অকাল মরণ।।

ঘরে ঘরে চলিয়াছে এই অবিচার।

অচলা হইয়া রব কোন সে প্রকার।।

এসব ছাড়িয়া যেবা করে সদাচার।

তার গৃহে চিরদিন বসতি আমার।।

এত শুনি ঋষিবর বলে, নারায়ণি।

অনাথের মাতা তুমি বিঘ্নবিনাশিনী।।

কিবা ভাবে পাবে সবে তোমা পদছায়া।

তুমি না রাখিলে ভক্তে কে করিবে দয়া।।

বিষ্ণুপ্রিয়া পদ্মাসনা ত্রিতাপহারিণী।

চঞ্চলা অচলা হও পাপনিবারণী।।

তোমার পদেতে মা মোর এ মিনতি।

দুখ নাশিবার তব আছে গো শকতি।।

কহ দেবি দয়া করে ইহার বিধান।

দুর্গতি হেরিয়া সব কাঁদে মোর প্রাণ।।

দেবর্ষির বাক্য শুনি কমলা উতলা।

তাহারে আশ্বাস দানে বিদায় করিলা।।

জীবের দুঃখ হেরি কাঁদে মাতৃপ্রাণ।

আমি আশু করিব গো ইহার বিধান।।

নারদ চলিয়া গেলে দেবী ভাবে মনে।

এত দুঃখ এত তাপ ঘুচাব কেমনে।।

তুমি মোরে উপদেশ দাও নারায়ণ।

যাহাতে নরের হয় দুঃখ বিমোচন।।

লক্ষ্মীবাণী শুনি প্রভু কহেন উত্তর।

ব্যথিত কি হেতু প্রিয়া বিকল অন্তর।।

যাহা বলি, শুন সতি, বচন আমার।

মর্ত্যলোকে লক্ষ্মীব্রত করহ প্রচার।।

গুরুবারে সন্ধ্যাকালে যত নারীগণ।

পূজা করি ব্রতকথা করিবে শ্রবণ।।

ধন ধান্য যশ মান বাড়িবে সবার।

অশান্তি ঘুচিয়া হবে সুখের সংসার।।

নারায়ণ বাক্যে লক্ষ্মী হরষ মনেতে।

ব্রত প্রচারণে যান ত্বরিত মর্তেতে।।

উপনীত হন দেবী অবন্তী নগরে।

তথায় হেরেন যাহা স্তম্ভিত অন্তরে।।

ধনেশ্বর রায় হয় নগর প্রধান।

অতুল ঐশ্বর্য তার কুবের সমান।।

হিংসা দ্বেষ বিজারিত সোনার সংসার।

নির্বিচারে পালিয়াছে পুত্র পরিবার।

একান্নতে সপ্তপুত্র রাখি ধনেশ্বর।

অবসান নরজন্ম যান লোকান্তর।।

পত্নীর কুচক্রে পড়ি সপ্ত সহোদর।

পৃথগন্ন হল সবে অল্প দিন পর।।

হিংসা দ্বেষ লক্ষ্মী ত্যাজে যত কিছু হয়।

একে একে আসি সবে গৃহে প্রবেশয়।।

এসব দেখিয়া লক্ষ্মী অতি ক্রুদ্ধা হল।

অবিলম্বে সেই গৃহ ত্যজিয়া চলিল।।

বৃদ্ধ রানি মরে হায় নিজ কর্মদোষে।

পুরীতে তিষ্ঠিতে নারে বধূদের রোষে।।

পরান ত্যজিতে যান নিবিড় কাননে।

চলিতে অশক্ত বৃদ্ধা অশ্রু দুনয়নে।।

ছদ্মবেশে লক্ষ্মীদেবী আসি হেন কালে।

উপনীত হইলেন সে ঘোর জঙ্গলে।।

সদয় কমলা তবে জিজ্ঞাসে বৃদ্ধারে।

কিবা হেতু উপনীত এ ঘোর কান্তারে।।

লক্ষ্মীবাক্যে বৃদ্ধা কহে শোন ওগো মাতা।

মন্দভাগ্য পতিহীনা করেছে বিধাতা।।

ধনবান ছিল পিতা মোর পতি আর।

লক্ষ্মী বাঁধা অঙ্গনেতে সতত আমার।।

সোনার সংসার মোর ছিল চারিভিতে।

পুত্র পুত্রবধূ ছিল আমারে সেবিতে।।

পতি হল স্বর্গবাসী সুখৈশ্বর্য যত।

একে একে যাহা কিছু হল তিরোহিত।।

ভিন্ন ভিন্ন হাঁড়ি সব হয়েছে এখন।

অবিরত বধূ যত করে জ্বালাতন।।

অসহ্য হয়েছে এবে তাদের যন্ত্রণা।

এ জীবন বিসর্জিতে করেছি বাসনা।।

বৃদ্ধা বাক্যে নারায়ণী কহেন তখন।

আত্মহত্যা মহাপাপ শাস্ত্রের বচন।।

ফিরে যাও ঘরে তুমি কর লক্ষ্মীব্রত।

সর্ব দুঃখ বিমোচিত পাবে সুখ যত।।

গুরুবারে সন্ধ্যাকালে বধূগণ সাথে।

লক্ষ্মীব্রত কর সবে হরষ মনেতে।।

পূর্ণ ঘটে দিবে শুধু সিঁদুরের ফোঁটা।

আম্রশাখা দিবে তাহে লয়ে এক গোটা।।

গুয়াপান দিবে তাতে আসন সাজায়ে।

সিন্দূর গুলিয়া দিবে ভক্তিযুক্ত হয়ে।।

ধূপ দীপ জ্বালাইয়া সেইখানে দেবে।

দূর্বা লয়ে হাতে সবে কথা যে শুনিবে।।

লক্ষ্মীমূর্তি মানসেতে করিবেক ধ্যান।

ব্রতকথা শ্রবণান্তে শান্ত করে প্রাণ।।

কথা অন্তে ভক্তিভরে প্রণাম করিবে।

অতঃপর এয়োগণ সিঁদুর পরাবে।।

প্রতি গুরুবারে পূজা যে রমণী করে।

নিষ্পাপ হইবে সে কমলার বরে।।

বার মাস পূজা হয় যে গৃহেতে।

অচলা থাকেন লক্ষ্মী সেই সে স্থানেতে।।

পূর্ণিমা উদয় হয় যদি গুরুবারে।

যেই নারী এই ব্রত করে অনাহারে।।

কমলা বাসনা তার পুরান অচিরে।

মহাসুখে থাকে সেই সেই পুত্রপরিবারে।।

লক্ষ্মীর হাঁড়ি এক স্থাপিয়া গৃহেতে।

তণ্ডুল রাখিবে দিন মুঠা প্রমাণেতে।।

এই রূপে নিত্য যেবা সঞ্চয় করিবে।

অসময়ে উপকার তাহার হইবে।।

সেথায় প্রসন্না দেবী কহিলাম সার।

যাও গৃহে ফিরে কর লক্ষ্মীর প্রচার।।

কথা শেষ করে দেবী নিজ মূর্তি ধরে।

বৃদ্ধারে দিলেন দেখা অতি কৃপা ভরে।।

লক্ষ্মী হেরি বৃদ্ধা আনন্দে বিভোর।

ভূমিষ্ট প্রণাম করে আকুল অন্তর।।

ব্রত প্রচারিয়া দেবি অদৃশ্য হইল।

আনন্দ হিল্লোলে ভেসে বৃদ্ধা ঘরে গেল।।

বধূগণে আসি বৃদ্ধা বর্ণনা করিল।

যে রূপেতে বনমাঝে দেবীরে হেরিল।।

ব্রতের পদ্ধতি যাহা কহিল সবারে।

নিয়ম যা কিছু লক্ষ্মী বলেছে তাহারে।।

বধূগণ এক হয়ে করে লক্ষ্মীব্রত।

স্বার্থ দ্বেষ হিংসা যত হইল দূরিত।।

ব্রতফলে এক হল সপ্ত সহোদর।

দুঃখ কষ্ট ঘুচে যায় অভাব সত্বর।।

কমলা আসিয়া পুনঃ আসন পাতিল।

লক্ষ্মীহীন সেই গৃহে লক্ষ্মী অধিষ্ঠিল।।

দৈবযোগে একদিন বৃদ্ধার গৃহেতে।

আসিল যে এক নারী ব্রত সময়েতে।।

লক্ষ্মীকথা শুনি মন ভক্তিতে পুরিল।

লক্ষ্মীব্রত করিবে সে মানত করিল।।

কুষ্ঠরোগগ্রস্থ পতি ভিক্ষা করি খায়।

তাহার আরোগ্য আশে পূজে কমলায়।।

ভক্তিভরে এয়ো লয়ে যায় পূজিবারে।

কমলার বরে সব দুঃখ গেল দূরে।।

পতির আরোগ্য হল জন্মিল তনয়।

ঐশ্বর্যে পুরিল তার শান্তির আলয়।।

লক্ষ্মীব্রত এই রূপে প্রতি ঘরে ঘরে।

প্রচারিত হইল যে অবন্তী নগরে।।

অতঃপর শুন এক অপূর্ব ঘটন।

ব্রতের মাহাত্ম্য কিসে হয় প্রচলন।।

একদিন গুরুবারে অবন্তীনগরে।

মিলি সবে এয়োগন লক্ষ্মীব্রত করে।।

শ্রীনগরবাসী এক বণিক নন্দন।

দৈবযোগে সেই দেশে উপনীত হন।।

লক্ষ্মীপূজা হেরি কহে বণিক তনয়।

কহে, এ কি পূজা কর, কিবা ফল হয়।।

বণিকের কথা শুনি বলে নারীগণ।

লক্ষ্মীব্রত ইহা ইথে মানসপূরণ।।

ভক্তিভরে যেই নর লক্ষ্মীব্রত করে।

মনের আশা তার পুরিবে অচিরে।।

সদাগর এই শুনি বলে অহংকারে।।

অভাগী জনেতে হায় পূজে হে উহারে।।

ধনজনসুখ যত সব আছে মোর।

ভোগেতে সদাই আমি রহি নিরন্তর।।

ভাগ্যে না থাকিলে লক্ষ্মী দিবে কিবা ধন।

একথা বিশ্বাস কভু করি না এমন।।

হেন বাক্য নারায়ণী সহিতে না পারে।

অহংকার দোষে দেবী ত্যজিলা তাহারে।।

বৈভবেতে পূর্ণ তরী বাণিজ্যেতে গেলে।

ডুবিল বাণিজ্যতরী সাগরের জলে।

প্রাসাদ সম্পদ যত ছিল তার।

বজ্র সঙ্গে হয়ে গেল সব ছারখার।।

ভিক্ষাঝুলি স্কন্ধে করি ফিরে দ্বারে দ্বারে।

ক্ষুধার জ্বালায় ঘোরে দেশ দেশান্তরে।।

বণিকের দশা যেই মা লক্ষ্মী দেখিল।

কমলা করুণাময়ী সকলি ভুলিল।।

কৌশল করিয়া দেবী দুঃখ ঘুচাবারে।

ভিক্ষায় পাঠান তারে অবন্তী নগরে।।

হেরি সেথা লক্ষ্মীব্রত রতা নারীগণে।

বিপদ কারণ তার আসিল স্মরণে।।

ভক্তিভরে করজোড়ে হয়ে একমন।

লক্ষ্মীর বন্দনা করে বণিক নন্দন।।

ক্ষমা কর মোরে মাগো সর্ব অপরাধ।

তোমারে হেলা করি যত পরমাদ।।

অধম সন্তানে মাগো কর তুমি দয়া।

সন্তান কাঁদিয়া মরে দাও পদছায়া।।

জগৎ জননী তুমি পরমা প্রকৃতি।

জগৎ ঈশ্বরী তবে পূজি নারায়ণী।।

মহালক্ষ্মী মাতা তুমি ত্রিলোক মণ্ডলে।

গৃহলক্ষ্মী তুমি মাগো হও গো ভূতলে।।

রাস অধিষ্ঠাত্রী তুমি দেবী রাসেশ্বরী।

তব অংশভূতা যত পৃথিবীর নারী।।

তুমিই তুলসী গঙ্গা কলুষনাশিনী।

সারদা বিজ্ঞানদাত্রী ত্রিতাপহারিণী।।

স্তব করে এইরূপে ভক্তিযুক্ত মনে।

ভূমেতে পড়িয়া সাধু প্রণমে সে স্থানে।।

ব্রতের মানত করি নিজ গৃহে গেল।

গৃহিণীরে গৃহে গিয়া আদ্যান্ত কহিল।।

সাধু কথা শুনি তবে যত নারীগণ।

ভক্তিভরে করে তারা লক্ষ্মীর পূজন।।

সদয় হলেন লক্ষ্মী তাহার উপরে।

পুনরায় কৃপাদৃষ্টি দেন সদাগরে।।

সপ্ততরী জল হতে ভাসিয়া উঠিল।

আনন্দেতে সকলের অন্তর পূরিল।।

দারিদ্র অভাব দূর হইল তখন।

আবার সংসার হল শান্তি নিকেতন।।

এইরূপে ব্রতকথা মর্ত্যেতে প্রচার।

সদা মনে রেখো সবে লক্ষ্মীব্রত সার।।

এই ব্রত যেই জনে করে এক মনে।

লক্ষ্মীর কৃপায় সেই বাড়ে ধনে জনে।।

করজোড় করি সবে ভক্তিযুক্ত মনে।

লক্ষ্মীরে প্রণাম কর যে থাক যেখানে।।

ব্রতকথা যেবা পড়ে যেবা রাখে ঘরে।

লক্ষ্মীর কৃপায় তার মনোবাঞ্ছা পুরে।।

লক্ষ্মীর ব্রতের কথা বড়ো মধুময়।

প্রণাম করিয়া যাও যে যার আলয়।।

লক্ষ্মীব্রতকথা হেথা হৈল সমাপন।

আনন্দ অন্তরে বল লক্ষ্মী-নারায়ণ।।

শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর বারমাস্যা

বছরের প্রথম মাস বৈশাখ যে হয়।

পূজা নিতে এস ওমা আমার আলয়।।

জ্যৈষ্ঠ মাসে ষষ্ঠী পূজা হয় ঘরে ঘরে।

এসো বসো তুমি ওমা পূজার বাসরে।।

আষাঢ়ে আসিতে মাগো নাহি করো দেরি।

পূজা হেতু রাখি মোরা ধান্য দুর্বা ধরি।।

শ্রাবণের ধারা দেখ চারি ধারে পড়ে।

পূজিবারে ও চরণ ভেবেছি অন্তরে।।

ভাদ্র মাসে ভরা নদী কুল বেয়ে যায়।

কৃপা করি এসো মাগো যত শীঘ্র হয়।।

আশ্বিনে অম্বিকা সাথে পূজা আয়োজন।

কোজাগরী রাতে পুনঃ করিব পূজন।।

কার্তিকে কেতকী ফুল চারিধারে ফোটে।

এসো মাগো এসো বসো মোর পাতা ঘটে।।

অঘ্রাণে আমন ধান্যে মাঠ গেছে ভরে।

লক্ষ্মীপূজা করি মোরা অতি যত্ন করে।।

পৌষপার্বনে মাগো মনের সাধেতে।

প্রতি গৃহে লক্ষ্মী পূজি নবান্ন ধানেতে।।

মাঘ মাসে মহালক্ষ্মী মহলেতে রবে।

নব ধান্য দিয়া মোরা পূজা করি সবে।।

ফাল্গুনে ফাগের খেলা চারিধারে হয়।

এসো মাগো বিষ্ণুজায়া পূজিগো তোমায়।।

চৈত্রেতে চাতক সম চাহি তব পানে।

আসিয়া বস ওমা দুঃখিনীর ভবনে।।

লক্ষ্মীদেবী বারমাস্যা হৈল সমাপন।

ভক্তজন মাতা তুমি করহ কল্যাণ।।

—সমাপ্ত—

 
2 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন সেপ্টেম্বর 5, 2012 in পুরনো লেখা