RSS

Tag Archives: পুরনো লেখা

নবরাত্রি গোলু: দাক্ষিণাত্যের এক আশ্চর্য প্রথা

সুসজ্জিত নবরাত্রি গোলু।

নবরাত্রি উৎসবের সময় দক্ষিণ ভারতের চারটি রাজ্যে (তামিলনাড়ু, কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কর্ণাটক) এবং শ্রীলঙ্কার তামিলদের মধ্যে একটি বিশেষ প্রথা পালিত হতে দেখা যায়। এটি হল “গোলু” বা “কোলু” প্রদর্শন। নানারকম পুতুল ও দেবমূর্তি একটি গ্যালারিতে সাজিয়ে প্রদর্শন করার নামই গোলু। গ্যালারির তাকগুলি সাধারণত ৭, ৯ বা ১১ বা কোনো বিজোড় সংখ্যায় থাকে। গোলুকে স্থানভেদে বোম্বে হাব্বা, বা বোম্মাই কোলু বা বোম্মালা কোলুভুও বলে। আমাদের বাংলার দুর্গাপূজায় নবপত্রিকা যেমন কৃষিসভ্যতার প্রতীক, দক্ষিণ ভারতীয় শারদ নবরাত্রির গোলুর সঙ্গেও কৃষিসভ্যতার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। কথিত আছে, আগেকার দিনে লোকে যাতে সেচখাল ও নদীখাতগুলি থেকে নিয়মিত পলি তুলে নেওয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে পারে, তাই বিশেষ রকমের মাটির পুতুল দিয়ে গোলু সাজানোর উৎসবের প্রবর্তন করা হয়েছিল।

 

বাঙালি সমাজে যেমন দুর্গাপুজোয় ঠাকুর দেখতে যাওয়ার প্রথা আছে, দক্ষিণ ভারতেও আত্মীয়-অতিথিরা বাড়িতে বাড়িতে যান গোলু দর্শন করতে। এই সময় গোলু-দর্শনকারী কুমারী মেয়ে ও বিবাহিতা নারীদের হাতে প্রসাদ, কুমকুম আর একটা ছোটো উপহার-ভর্তি থলি তুলে দেওয়া হয়। সন্ধ্যাবেলা গোলুর সামনে “কোলাম” বা রঙিন আলপনার (রঙ্গোলি) মাঝে একটি ছোটো প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া হয়। প্রদীপটিকে বলে “কুতুভিলাক্কু”। তারপর ভক্তিমূলক স্তবস্তোত্রাদি পাঠ করা হয়। পূজার পর দেবীর উদ্দেশ্যে ভোগ দেওয়া হয়।

 

গোলুতে নানারকম মূর্তি থাকে। বেশিরভাগ মূর্তিই পৌরাণিক দেবদেবীদের। নিয়ম হল, তার মধ্যে অন্তত একটি কাঠের পুতুল রাখা। সেই সঙ্গে একটি বালক ও একটি বালিকার পুতুলও থাকা চাই। এদের বলে “মারাপাচ্চি বোম্মাই”। মহানবমীর দিন দক্ষিণ ভারতীয়রা সরস্বতী পূজা করে। এই দিন তারা বাঙালিদের মতোই বইখাতা, বাদ্যযন্ত্র দেবীর পায়ের কাছে রেখে পুজো করে। পাশাপাশি, নানারকম যন্ত্রপাতি বা অস্ত্রশস্ত্র রেখে আয়ূধ পূজার প্রথাও আছে। এমনকি গাড়ি ভালো করে ধুয়ে ও সাজিয়ে সেগুলিকেও বিশেষভাবে পূজা করা হয়।

 

বিজয়াদশমীর দিনটি হিন্দুমাত্রেই পরম পবিত্র মনে করেন। এই দিন সব দেবশক্তির হাতে অশুভশক্তির চরম পরাজয় ঘটে। বিজয়াদশমীর দিন সন্ধ্যাবেলা গোলুর একটি পুতুলকে প্রতীকীভাবে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়। আর কলসম বা ঘটটিকে উত্তর দিকে একটু সরিয়ে দিয়ে সেই বছরের গোলুর সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। গোলু উৎসব নির্বিঘ্নে শেষ করতে পারার জন্য বিশেষ প্রার্থনাও করা হয়। তারপর গোলুর পুতুল ও মূর্তিগুলিকে পরের বছরের জন্য তুলে রেখে দেওয়া হয়।

 

ট্যাগ সমুহঃ

হিন্দুশাস্ত্র: জ্ঞানকাণ্ড ও কর্মকাণ্ড

বিপিনবিহারী ঘোষাল সংকলিত হিন্দুশাস্ত্র: জ্ঞানকাণ্ড ও কর্মকাণ্ড (১৮৯৫) বই থেকে আধুনিক সরল বাংলা গদ্যে রূপান্তরিত।

আমাদের দেশের প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রগুলিতে ধর্ম ও সাধনা সম্পর্কে যে বিভিন্ন রকম মত দেখতে পাওয়া যায়, প্রাচীন আর্য শাস্ত্রকারেরা সেগুলিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছিলেন এবং সেই সব বিভিন্ন রকম মত ও উপদেশগুলির মধ্যে যে একটা যোগ বা সম্বন্ধ আছে, তা-ও তাঁরা অনেক জায়গায় বলে গেছেন। যেমন—ভগবান শিব এক জায়গায় পার্বতীকে বলছেন,—

নানা তন্ত্রে পৃথক্‌ চেষ্টা ময়োক্তা গিরিনন্দিনি।

ঐক্যজ্ঞানং যদা দেবি তদা সিদ্ধিমবাপ্নুয়াৎ।।

মুণ্ডমালা তন্ত্র, ৬ পটল।

হে পার্বতী, আমি অধিকারী অনুসারে নানা তন্ত্রে নানা রকম সাধনা ও পূজা-উপাসনার বিধি দিয়েছি। সাধক যখন সেই সব নানা রকম ব্যবস্থার মধ্যেও ঐক্য দর্শন করে, তখন তার সিদ্ধিলাভ হয়।

প্রথমত, যাঁরা একটু বেশি জ্ঞান রাখেন ও চিন্তা করেন, যাঁদের বুদ্ধি সূক্ষ্ম তত্ত্বগুলি বুঝতে সক্ষম এবং যাগযজ্ঞ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের অনুষ্ঠানে যাঁদের পুরোপুরি শ্রদ্ধা বা তৃপ্তি জন্মায় না, তাঁদের জন্য শাস্ত্রকারেরা নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী তত্ত্বজ্ঞান-স্বরূপ মহাসত্যগুলির উপদেশ দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, যাঁদের জ্ঞান তুলনামূলকভাবে অল্প বা যাঁরা এ সম্পর্কে ঠিকঠাক বিচার করতে পারেন না,[*] তাঁদেরও ধর্মপ্রবৃত্তি পরিতৃপ্ত করবার জন্য এবং ভবিষ্যতে তাদেরও তত্ত্বজ্ঞান লাভের উপযুক্ত করবার জন্য তাঁরা স্থূল ভাবের পূজা, উপাসনা বা অনুষ্ঠানপদ্ধতি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

প্রথমোক্ত সবল অধিকারী ব্যক্তিদের জন্য যে শাস্ত্রের উপদেশ দেওয়া হয়েছে, তার নাম জ্ঞানকাণ্ড; আর শেষোক্ত দুর্বল অধিকারীদের জন্য যে শাস্ত্র লেখা হয়েছে, তার নাম কর্মকাণ্ড।

কর্মকাণ্ডোজ্ঞানকাণ্ড ইতি ভেদোদ্বিধামতঃ।

ভবতি দ্বিবিধোভেদাজ্ঞানকাণ্ডস্য কর্মণঃ।।

শিব সংহিতা ১।২০

ভগবান শিব বললেন—

জ্ঞানকাণ্ড ও কর্মকাণ্ড ভেদে শাস্ত্রে দুই রকম মত দেখা যায়। জ্ঞানকাণ্ড ও কর্মকাণ্ড—এগুলি আবার দুটি দুটি করে ভাগে বিভক্ত।

বেদস্তাবৎ কাণ্ডদ্বয়াত্মকঃ।

তত্র পূর্বস্মিন্‌ কাণ্ডে নিত্যনৈমিত্তিককাম্যনিষিদ্ধরূপং

চতুর্বিধং কর্ম প্রতিপাদ্যং।

তৈত্তিরীয় সংহিতা ১৭১।১

সমগ্র বেদ দুই ভাগে বা দুই কাণ্ডে বিভক্ত। তার মধ্যে পূর্বকাণ্ডে নিত্য, নৈমিত্তিক, কাম্য ও নিষিদ্ধ এই চার রকমের কর্মের বিষয় বর্ণিত হয়েছে।

অত উত্তরকাণ্ড আরব্ধব্যঃ। আত্যন্তিকপুরুষার্থসিদ্ধিশ্চ দ্বিবিধা। সদ্যোমুক্তিঃ ক্রমমুক্তিশ্চেতি। তস্মাদুত্তরকাণ্ডে ব্রহ্মোপদেশ-ব্রহ্মোপাস্তিশ্চেত্যুভয়ং প্রতিপাদ্যতে।

তৈত্তিরীয় সংহিতা, প্রথম কাণ্ড, প্রথম প্রপাঠক, প্রথম অনুবাক্‌।

তারপর উত্তরকাণ্ডে সদ্যোমুক্তি ও ক্রমমুক্তি নামে দুই রকম আত্যন্তিক পুরুষার্থসিদ্ধির বিষয় নির্ণয় করা হয়েছে। এজন্য উত্তরকাণ্ডে ব্রহ্মবিষয়ক উপদেশ ও ব্রহ্মোপাসনা এই দুইটি বিষয় আলোচনা করা হয়।

দ্বাবিমাবথ পন্থানৌ যত্র বেদাঃ প্রতিষ্ঠিতাঃ।

প্রবৃত্তিলক্ষণো ধর্মো নিবৃত্তৌ চ বিভাষিতঃ।।

বাজসনেয় সংহিতার ভাষ্যে শঙ্করাচার্যের বাণী

বেদে দুই রকম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত আছে। যথা—(১) প্রবৃত্তিলক্ষণ ধর্ম বা কর্মকাণ্ড, এবং (২) নিবৃত্তিলক্ষণ ধর্ম বা জ্ঞানকাণ্ড।

এই কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ডের মধ্যে কর্মকাণ্ড বিনাশী, অর্থাৎ অনিত্য ফল দান করে এবং জ্ঞানকাণ্ড অবিনাশী, অর্থাৎ অনন্ত ফলদায়ী। যেমন, ব্যাসদেব শুকদেবকে বলেছেন—

কর্মবিদ্যাময়াবেতৌ ব্যাখ্যাস্যামি ক্ষরাক্ষরৌ।

মহাভারত, মোক্ষধর্ম পর্বাধ্যায় ৬৭।৩

নশ্বর কর্ম এবং অবিনশ্বর জ্ঞান-এই দুইয়ের বিষয় আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি।


[*] উন্নত ও গভীর বিষয়গুলি সর্বদা মনের মধ্যে বিচার করতে অভ্যাস করা বিশেষ প্রয়োজনীয়। মানুষের মধ্যে যাঁরা চিন্তাশীল নন, তাঁরা একরকম মানুষের মধ্যে গণ্যই নন, একথা আমাদের দেশের শাস্ত্রকারের বার বার বলে গিয়েছেন। যিনি চিন্তাশীল নন, তিনি হাজার রকম বিদ্যে শিখলেও জ্ঞানহীনদের মধ্যেই গণ্য হন।

টমাস কার্লাইল তাঁর এক চিঠিতে লিখেছেন—

“It is not books alone, or by books chiefly that a man becomes in all points a man.”

Treasury of Modern Biography, p. 293.

বিশিষ্ট আমেরিকান বুদ্ধিজীবী এমারসন বলেছেন—

“The man who thinks is the king; all else are journeymen.”

An Evening with Emerson.

by David Maerae, in The Americans at Home.

 

ট্যাগ সমুহঃ

দুর্গা-পরিবার

[পূর্ববর্তী পোস্টে কিশোরীলাল রায় রচিত দেবতত্ত্ব (১৮৮৫) গ্রন্থ থেকে দেবী দুর্গা, জগদ্ধাত্রী ও কালী—এই দেবীত্রয়ীর স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। এই পোস্টে ওই একই বই অবলম্বনে দেবী দুর্গার সঙ্গে পূজিত শিব, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকের স্বরূপ বর্ণনা করা হল। এই লেখাটি মূল রচনার আধুনিক সরল বাংলা গদ্যে রূপান্তরণ।]

 

দুর্গা পরিবার

শিব

প্রলয়কর্তা অর্থে ঈশ্বরের নাম শিব। কিছুকাল না গেলে কোনো বস্তুর ধ্বংস অসম্ভব। তাই শিবকে কাল ও মহাকালও বলা হয়। যিনি সব কিছুর ধ্বংসকর্তা তাঁর আবার ধ্বংস কী? সুতরাং শিবের একটি বিশেষ নাম মৃত্যুঞ্জয়। বিশ্বকে ঈশ্বরের শরীর বলা হয়েছে। শিবোপাসকগণ মনে করেন ও সাধারণতও এই বিশ্বাস প্রবল দেখা যায় যে, মহাদেবের ললাটে ও মানুষের চোখের মতো তিনটি চোখ আছে। বাস্তবিক তা নয়। সূর্য, চাঁদ ও আগুনই মহাদেবের তিন চোখ, তাই তিনি ত্রিলোচন। যথা, শঙ্করাচার্য-কৃত অপবাদভঞ্জন স্তোত্রে “বন্দে সূর্যশশাঙ্ক বহ্নিনয়নং” ইত্যাদি। তিন চোখ তিন রকমের বলে মহাদেবের এক নাম বিরুপাক্ষ। জীর্ণদশায় প্রলয় ঘটে ও কালের বয়স অপরিমেয় বলে মহাদেবের মূর্তি বুড়ো মানুষের শরীরের মতো কল্পিত হয়েছে, তাঁকে প্রায় সর্বদা বৃদ্ধ বলে বর্ণনা কর হয়। চিতাভস্ম, শ্মশান ও নরমুণ্ড প্রভৃতি ধ্বংস বা মৃত্যুর স্মারক বলে ওই সবের দ্বারা তাঁকে দেখা হয়েছে। ধ্বংসকর্তা স্বয়ং মৃত্যুঞ্জয়, সুতরাং তাঁর মৃত্যুঞ্জয়ত্ব দেখানোর জন্য তিনি বিষধর সর্পজড়িত বলে বর্ণিত। মহাদেবরূপী কাল ও জড়জগৎরূপী প্রকৃতি সংযোগেই সব কিছুর উৎপত্তি হয়, সুতরাং মহাদেব ও দুর্গাকে জগতের পিতা ও মাতা বলা হয়েছে। কালিদাস বলেছেন “জগতঃ পিতরৌ বন্দে পার্বতী পরমেশ্বরৌ।” এই জন্য শিবলিঙ্গ ও গৌরীপট্টেরও কল্পনা। শবশিবারূঢ়া কালীমূর্তি, শক্তিহীন হলে শিবের যে অবস্থা ঘটে তা দেখানোর জন্য কল্পিত হয়েছে। কালী মহাদেবের শক্তি, সুতরাং শিবের দেহ থেকে শক্তি পৃথক হয়ে বেরিয়ে এলে শিব শক্তিহীন হয়ে শবের মতো পড়ে থাকেন। শঙ্করাচার্য আনন্দলহরীতে বলেছেন, “শিবঃ-শক্ত্যা-যুক্তো ভবতি শক্তঃ প্রভবিতুং। নচদেবং দেবোনখলু কুশলঃ স্পন্দিতুমপি।” অর্থাৎ, শিবের প্রভাব শক্তিযুক্ত থাকলেই; নয়তো তাঁহার নড়াচড়ার শক্তিও থাকে না। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের প্রকৃতি খণ্ডেও ওই কথা আছে। “শিবশক্তস্তয়া শক্ত্যাশবাকার স্তয়া বিনা।” অর্থাৎ, শিব শক্তিসহ থাকলেই শক্তিমান, নচেৎ শবাকার হন। মহাদেবকে বৃষবাহন বলার তাৎপর্য্য এই যে, কালের গতি বৃষভের গতির মতো ধীর অথচ নিশ্চিত। মেঘই মহাদেবের জটাজুট, সুতরাং শিবজটা থেকে গঙ্গার নির্গম হয় এর অর্থ এই যে, মেঘ থেকে জল নির্গত হয়। মহাদেবকে ভোলামহেশ্বর ও ধুস্তরফলাদি ভক্ষণকারী বলার তাৎপর্য এই যে, কালকে অনেক সময় মদবিহ্বল ব্যক্তির মতো কাজ করতে দেখা যায়। যেমন দুর্যোধনের রাজ্যভোগ ও যুধিষ্ঠিরের বনবাস প্রভৃতি। মহাদেব বৃদ্ধ কিন্তু উমা নিত্যযৌবনা, এর তাৎপর্য এই যে সময় একবার গেলে আর ফেরে না এবং তার বয়সেরও অন্ত নেই। কিন্তু পৃথিবী প্রতি বছর অভিনব বেশ ধারণ করে ও একবার বসন্ত শেষ হলেও তা বার বার আসতে থাকে।

 

কাল শূন্যের অনুরূপ ও আচ্ছাদনবিহীন বলে তাকে শ্বেতকায় ও দিগম্বর বলা হয়েছে। মহাদেবকে আদিদেব বলার তাৎপর্য এই যে, সবার আগেও কাল বিদ্যমান ছিল। সবই কালে ঘটছে। সুতরাং মহাদেব সর্বজ্ঞ, কালেই জ্ঞানলাভ হয়, সুতরাং তিনি জ্ঞানদাতা, এবং যশস্বী মহাত্মাদের কাল বাঁচিয়ে রাখে, সুতরাং তিনি ভক্তমুণ্ডমালী। মহাভারতে সুরথ সুধন্বার মুণ্ডগ্রহণ করার জন্য মহাদেবের যে আগ্রহ বর্ণিত হয়েছে, তাতে তাঁকে ভক্তমুণ্ডমালী শব্দের বাচ্য করে তুলেছে বলতে হবে।

 

অনন্ত বা শূন্যের বলরামরূপ কল্পনা করে কালের কল্পিতরূপ মহাদেবের সদৃশ করা হয়েছে। একটি মনোহরশায়ী গানেও বলা হয়েছে, “তার পর একজন বৃষভেতে আরোহণ, দাদা বলাইর মতন।” বাস্তবিক বলরাম ও মহাদেবের রূপে বিলক্ষণ সাদৃশ্য আছে। অনন্ত কাল অনন্ত আকাশের সদৃশ্যই বটে। শাস্ত্রে অনেক জায়গায় শিব ও দুর্গাকে পুরুষ ও প্রকৃতিও বলা হয়েছে।

 

রুদ্রের আট রকম শরীরের বর্ণনাও আছে। যথা— সূর্য, জল, পৃথিবী, অগ্নি, আকাশ, বায়ু, দীক্ষিত ব্রাহ্মণ ও চন্দ্র। দীক্ষিত ব্রাহ্মণের বদলে কোনো কোনো স্থলে জীব লেখা হয়েছে।

 

গণেশ

সিদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অর্থে ঈশ্বরের নাম গণেশ। আগে সিদ্ধিকামনা করেই লোকে সব কাজে হাত লাগায়। সুতরাং সব দেবতার আগেই গণেশের পূজার নিয়ম হয়েছে। ইঁদুর নানা রকম বস্তু কেটে দেয়, সুতরাং বিঘ্নছেদনকারীর বাহন কল্পনা করতে ইঁদুরই সুসঙ্গত হয়। বিঘ্নস্বরূপ অন্ধকারের কাছে জ্যোতিস্বরূপ বলে গণেশের গায়ের রং সিঁদুরের মতো। হাতি যেমন শুঁড় দিয়ে জল তুলে ইচ্ছা মতো পান করে বা ফুঁ দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, সেই রকম গণেশও ইচ্ছামতো বিঘ্নরাশি তুলে দূরে ফেলে দিতে পারেন। তাই তাঁকে গজানন (অর্থাৎ, যাঁর হাতির মতো মুখ) বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সমস্ত সিদ্ধি তিনি নিজেতে সঞ্চিত করে রেখেছেন, তাই তাঁকে লম্বোদর বলে।

 

লক্ষ্মী

শোভা ও সম্পত্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা এই অর্থে ঈশ্বরের নাম লক্ষ্মী। চন্দ্র খুবই সুন্দর, তাই চন্দ্রকে লক্ষ্মীর ভাই বলা হয়। সম্পত্তি কারো কাছে স্থির থাকে না, সুতরাং লক্ষ্মী চঞ্চলা। পদ্মবন অত্যন্ত সুন্দর জায়গা, তাই লক্ষ্মীর নাম পদ্মালয়া। শোভাতে কামের জন্ম হয়, তাই লক্ষ্মী কন্দর্প বা কামদেবের জননী বলে অভিহিত হয়েছেন।

 

সরস্বতী

বাক্যের সঙ্গে জ্ঞান সংশ্লিষ্ট। অতএব সরস্বতী কেবল শব্দের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাই নন, জ্ঞানাধিষ্ঠাত্রী দেবতাও বটে। বেদ ছাড়া অন্যান্য বিদ্যা ও বাক্যের অধিপতি—এই অর্থে ঈশ্বরের নাম সরস্বতী। বেদের অধিপতি অর্থে তাঁর নাম সাবিত্রী (এই সাবিত্রী-সত্যবান কাহিনির পৌরাণিক চরিত্র নন)। সরস্বতীকে শ্বেতপদ্মে অধিষ্ঠিতা, শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা, শ্বেতবর্ণা ও শ্বেতবীণাধরা বলার তাৎপর্য এই যে— বিদ্যা দিয়ে মনের অজ্ঞান-অন্ধকার দূর হয়, সুতরাং অজ্ঞান অন্ধকার-স্বরূপ, বিদ্যা আলোক স্বরূপ। এবং আলোক স্বরূপ প্রকাশে শ্বেতবর্ণের আবশ্যক। সরস্বতীর হাতে বই; কারণ বইই জ্ঞানের ভাণ্ডারস্বরূপ। অতএব দেখা যাচ্ছে যে নিরাকারা সরস্বতীর রূপ কল্পনা করতে হলে তাঁকে শ্বেতবর্ণ-বিশিষ্ট বলে কল্পনা করলেই প্রশংসনীয় রূপক হয়। ধর্মতত্ত্ব-এর কোনো লেখক যথার্থই বলেছেন যে, মাঘমাসে সরস্বতী পূজা বিহিত হওয়ার কারণ এই যে, এই সময়ে বসন্তের ছায়া পড়ে এবং বসন্তকালই সঙ্গীতবিলাসের সর্বোৎকৃষ্ট সময়। বাস্তবিক সঙ্গীতেশ্বরীর আরাধনা বসন্তের প্রারম্ভেই হওয়া উচিত। সরস্বতী যে শাস্ত্রকারগণের মতে ঈশ্বরের নামান্তর মাত্র; তা “বিশ্বরূপা বিশালাক্ষী” ইত্যাদি বাক্য আলোচনা করলেই বোঝা যাবে।

 

কার্তিক

কেবল সংগ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা, এই অর্থে ঈশ্বরের নাম কার্তিক। যুদ্ধদেবের মতি তেজোময় হওয়া উচিত, সুতরাং কার্তিকেয়কে অগ্নির পুত্রও বলা হয়েছে। কৃত্তিকা নামক আগুনরঙা ছয়টি তারা, ঐ অগ্নির পুত্র বা মহাদেবের পুত্রকে পালন করেছিলেন, এই জন্য তাঁর নাম কার্তিকেয় বা ষড়ানন হয়েছে। অগ্নির মত তেজবিশিষ্ট দেবতার অগ্নিবর্ণা পালয়িত্রী কল্পনা করাই যুক্তিসঙ্গত। যোদ্ধা ও সুন্দরবর্ণ ময়ূরই কার্তিকের উপযুক্ত বাহন। যোদ্ধারা ভালভাবে রণসজ্জা করে ভাল একটা বাহনে চেপেই যুদ্ধক্ষেত্রে যান; সুতরাং যুদ্ধের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অর্থে ঈশ্বরের রূপ ও বাহনাদি কল্পনা করতে হলে, তাঁকে অতি সুন্দর পুরুষ ও সুন্দর বাহনে আরূঢ় বলেই বর্ণনা করতে হয়।

 

ট্যাগ সমুহঃ

দুর্গা-জগদ্ধাত্রী-কালী

[কিশোরীলাল রায় রচিত দেবতত্ত্ব (১৮৮৫) গ্রন্থ থেকে আধুনিক সরল বাংলা গদ্যে রূপান্তরিত।]

সপরিবার দুর্গা

মূল প্রকৃতিকে ঈশ্বরের সৃষ্টিশক্তি বা মায়াশক্তি বলে। আবার পঞ্চভূত ইত্যাদি জড় পদার্থের সমষ্টিকেও প্রকৃতি বলে। দুর্গা মূল প্রকৃতির এক অংশ। ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী ও দুর্গতিনাশকারী—এই অর্থে ঈশ্বরের নাম দুর্গা। জড় পদার্থ জগৎ, পর্বত সবকিছু দিয়ে ধরা আছে; আর পর্বতের মধ্যে হিমালয় সবচেয়ে বড়ো—অতএব দুর্গাকে পার্বতী ও হিমালয়নন্দিনী বলে। গঙ্গাকেও হিমালয়নন্দিনী বলে, যেহেতু তা হিমালয় থেকে নিঃসৃত হয়েছে সাগর-অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে। এই জন্যই দুর্গাকে গঙ্গার সপত্নী বলে। কিন্তু মহাশক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অর্থেই সচরাচর ঈশ্বরকে দুর্গা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। দশ হাতই সেই অর্থে মহাশক্তির পরিচায়ক। পরাক্রমাধিষ্ঠাত্রী দেবতার সিংহই উপযুক্ত বাহন। দুর্জন বা অসুরেরাই জগতের দুর্গতির প্রধান কারণ, অতএব দুর্গা অসুরনাশিনী বলে বর্ণিত হয়েই একপ্রকারে দুর্গতিনাশিনী বলে বর্ণিত হয়েছেন। যখন নানা রকমের দুর্গতি আছে, তখন অন্য প্রকার দুর্গতিনাশিনী অর্থেও দুর্গাকে দুর্গা বলা যায়। শারদীয়া দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে সরস্বতী ও কার্তিক ইত্যাদি মূর্তিও দেখা যায়। এর তাৎপর্য এই যে, দুর্গতিনাশিনী মহাশক্তির থেকেই যখন যুদ্ধশক্তি উৎপন্ন হয়, তখন যুদ্ধদেবতা কার্তিককে দুর্গার ছেলে বলা যায়। যখন ওই মহাশক্তি থেকেই দুর্গতি ও বিঘ্ন বিনষ্ট হয়ে সিদ্ধি প্রাপ্ত হওয়া যায়, তখন সিদ্ধিদেবতা গণেশও দুর্গার সন্তান বলে পরিগণিত হতে পারে। একই রকম ভাবে বাকশক্তি ও জ্ঞানশক্তি দ্বারাও দুর্গতি দূর হয় বলে এবং তা মহাশক্তির এক অংশ বলে সেই শক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা সরস্বতীকেও দুর্গার সঙ্গে দেখা যায়। মহাশক্তির অংশ—তাই শোভা ও সম্পত্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা লক্ষ্মীও দুর্গার পাশে বিরাজ করেন। মহাশক্তি বলে দুর্গাকে নিদ্রা, ক্ষুধা, লজ্জা, তুষ্টি, আগুনের দাহিকা শক্তি, সূর্যের তেজ, জলের শীতলতা, ব্রাহ্মণের ব্রহ্মণ্যশক্তি, ক্ষত্রিয়ের ক্ষত্রিয়শক্তি, তপস্বীর তপস্যাশক্তি, ক্ষমাবানের ক্ষমাশক্তি, পৃথিবীর ধারণ ও শস্য-উৎপাদন ক্ষমতা প্রভৃতি বলে স্তব করা হয়েছে ও হয়ে থাকে। যাঁরা শাস্ত্রতত্ত্ব বোঝেন না, তাঁরাই মাটির দুর্গাপ্রতিমাকে দুর্গা মনে করেন। কিন্তু জ্ঞানী ও শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে, ঈশ্বরকেই অবস্থা বিশেষে দুর্গা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যথা—”গণেশজননী দুর্গা রাধা লক্ষ্মী সরস্বতী। সাবিত্রী চ সৃষ্টিবিধৌ প্রকৃতিঃ পঞ্চমী স্মৃতা।” অর্থাৎ, মূল প্রকৃতিকে পাঁচ অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। যথা—দুর্গা, রাধা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, সাবিত্রী। দুর্গাতে তেজের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা বলা হয়েছে। যথা—”তেজস্বরূপা পরমা তদধিষ্ঠাত্রী দেবতা।” হিন্দুশাস্ত্রের একটি প্রধান লক্ষণ এই যে, এতে ঈশ্বরের নাম নিয়ে অনেক প্রসঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে। যেমন নারায়ণের সহস্র নাম, শত নাম, ষোড়শ নাম, অষ্ট নাম ইত্যাদি। এই রকম দুর্গারও সহস্র নাম বর্ণিত হয়েছে। ঈশ্বরের নাম নিয়ে এত প্রসঙ্গ করা হয়েছে যে, প্রায় প্রত্যেক ব্যাপারেই একটি পৃথক নাম নেওয়ার বিধি দেওয়া হয়েছে। যথা—”ঔষধে চিন্তয়েদ্বিষ্ণুং ভোজনে জনার্দনং। শয়নে পদ্মনাভঞ্চ বিবাহে চ প্রজাপতিং।।” ইত্যাদি। ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ রক্ষার জন্য ভিন্ন ভিন্ন নাম দেওয়া হয়েছে। যথা—”পায়ান্মধ্যং দিনে বিষ্ণু প্রাতর্নারায়ণ্যেবতু। মধুহাচাপারাহ্নে চ সায়ং রক্ষতু মাধবঃ।।” ইত্যাদি। ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন নামে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান কথিত হয়েছে। যথা—মানসহ্রদে মৎস্য, হস্তিনাপুরে গোবিন্দ, কুরুক্ষেত্রে কুরুধ্বজ, হিমাচলে শূলবাহু, অবন্তিনগরে বিষ্ণু, বারাণসীতে কেশব, মর্ত্যলোকে অগস্ত্য, ভুবর্লোকে গরুড়, স্বর্গলোকে বিষ্ণু, জম্বুদ্বীপে চতুর্বাহু ইত্যাদি। শিব ও রাধিকারও সহস্র নাম কথিত হয়েছে। কিন্তু চৈতন্যদেবের সময়ে ঈশ্বরের নামের যে প্রকার অত্যধিক আলোচনা হয়েছে, এমন আর কোনো সময়েই হয়নি। এই বিষয়ে খ্রিস্টানদের সঙ্গে হিন্দুদের সম্পূর্ণ উল্টো রীতি দেখা যায়। খ্রিস্টধর্মে অনর্থক ঈশ্বরের নাম নেওয়া অপরাধ। কিন্তু হিন্দুদের মতে, অবহেলা করে নাম নেওয়াও মহাপুণ্যজনক। চৈতন্যদেবের সময়ে মহাভাগবত হরিদাস ঠাকুর প্রতিদিন তিন লক্ষ বার হরিনাম জপ করতেন। আজও অনেক হিন্দু রোজ শত শত বার ঈশ্বরের নাম জপ করে থাকেন। নাম জপের এত প্রাবল্য ভারতবর্ষ ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশেই দেখা যায় না। এর একটি প্রধান কারণ এই যে, অন্যান্য জাতি অপেক্ষা ভারতীয়রা ঈশ্বরের দাস হওয়ার চেয়ে ঈশ্বরের প্রেমিক হতেই বেশি ভালবাসে।

দুর্গাকে প্রকৃতির অংশ বলে ও শাস্ত্রে অনেক জায়গায় তাঁকে স্বয়ং প্রকৃতি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পুরুষ ও প্রকৃতিকে কখনও কখনও কৃষ্ণ ও রাধা, কখনও কখনও শিব ও দুর্গা এবং কখনও কখনও লিঙ্গ ও যোনি বলা হয়েছে। যোনিপূজা বললে শাস্ত্র-না-জানা লোক তাকে যেভাবে গ্রহণ করে, দার্শনিক ও শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি কখনই তাকে সেভাবে গ্রহণ করে না। উক্তস্থলে সত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের সমবায়ের নামই যোনি এবং ঐ ত্রিগুণের সাম্য অবস্থার নামই প্রকৃতি।

পুরুষের যে রকম দশাবতার বর্ণিত হয়েছে, তেমনই প্রকৃতিরও দশাবতারের (দশমহাবিদ্যা) বর্ণনা আছে। যথা—”কৃষ্ণরূপা কালিকাস্যাৎ রামরূপা চ তারিণী। বগলা কূর্মমূর্তিস্যান্মীনো ধূমাবতীভবেৎ।। ছিন্নমস্তা নৃসিংহর্স্যাদ্ববরাহশ্চৈব ভৈরবী। সুন্দরী যামোদগ্ন্যর্স্যাদ্বামনো ভুবনেশ্বরী।। কমলা বৌদ্ধরূপাস্যাৎ দুর্গাস্যাৎ কল্পিরূপিণী।” ইত্যাদি। ইতি শব্দকল্পদ্রুমধৃত মুণ্ডমালা তন্ত্র।

জগদ্ধাত্রী

ছান্দোগ্য উপনিষদে মহাশক্তি বিষয়ক একটি সুন্দর গল্প আছে। সেটি হল: এক সময় ইন্দ্র প্রভৃতি দেবতারা মোহে পড়ে নিজেদের ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেছিলেন। তা দেখে ভগবান এক অনির্বচনীয় কোটিচন্দ্রসূর্যের জ্যোতিঃপুঞ্জের রূপে তাঁদের সামনে দেখা দিলেন। তিনি বায়ুকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে? বায়ু উত্তর দিলেন, আমি মাতরিশ্বা, আমি সক কিছু ওড়াতে পারি। জ্যোতিঃপুঞ্জ একটি ঘাস সামনে রেখে বললেন, এই ঘাসটুকু ওড়াও। বায়ু কোনোভাবেই তা ওড়াতে না পেরে লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলেন। তারপর অগ্নি হাজির হলে তাঁর পরিচয় জানতে চাওয়া হল। অগ্নি উত্তর দিলেন, আমি অনল, আমি সব কিছু পোড়াতে পারি। জ্যোতিঃপুঙ্ক তাঁকে সেই ঘাসটি পোড়াতে বললে, অগ্নি তা পোড়াতে না পেরে লজ্জা পেয়ে গেলেন। কাত্যায়নী তন্ত্রের মতে, এই জ্যোতিঃপুঞ্জ পরে চতুর্ভূজা জগদ্ধাত্রীরূপে বিনয়াবনত দেবগণের সামনে কিছুক্ষণ প্রকাশিত থেকে অন্তর্হিতা হলেন। এই জগদ্ধাত্রীও দুর্গার রূপান্তর বিশেষ। শোভা, শক্তি ও জ্ঞানদাত্রীত্ব সূচনার্থে ইনি জ্যোতির্ময়ী বলে বর্ণিত হয়েছেন।

কালী

কালীকে দুর্গার ললাট থেকে উৎপন্না বলা হয়েছে। যথা—”দুর্গার ললাটে জাতা জলদবরণী।” কালী দুর্গার ললাট থেকে উৎপন্না হয়েছেন—এই বাক্যের তাৎপর্য যে, ললাটের সংকোচনেই ক্রোধভাব প্রকাশিত হয় বলে সদা ক্রোধান্বিতা; রণরঙ্গিনী করাল-বদনা কালীকে ললাট-সম্ভবা বলা হয়েছে। বাস্তবিক কালীও দুর্গার রূপান্তর বিশেষ। ক্রোধাবস্থাপন্না শক্তিকেই কালী বলা বয়েছে। ভয়ানক ভাবান্বিতা বিশ্বব্যাপিনী শক্তি—এই অর্থে ঈশ্বরের নাম কালী। এই জন্য কালীর বিবিধ প্রকার ভয়ানক মূর্তি কল্পিত হয়েছে। ধূমাবতী, ছিন্নমস্তা ও ভৈরবী—এ সবারই অতি ভয়ংকর মূর্তি। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে একটি ধ্যান দেওয়া হল। দক্ষিণাকালীর ধ্যান—

করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভূজাম্। কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালাবিভূষিতাম্।। সদ্যশ্চিন্নশিরঃখড়্গবামাধোর্ধ্বকরাম্বুজাম্। অভয়ং বরদং চৈব দক্ষিণোর্ধ্বাধঃপাণিকাম্।। মহামেঘপ্রভাং শ্যামাং তথা চৈব দিগম্বরীম্। কর্ণাবসক্তমুণ্ডালীগলদ্রুধিরচর্চিতাম্।। কর্ণাবতংসতানীতশবযুগ্মভয়ানকম্। ঘোরদ্রংষ্টাং করালাস্যাং পীনোন্নতপয়োধরাম্।। শবানাং করসংঘাতৈঃ কৃতকাঞ্চীং হসন্মুখীম্। সৃক্কদ্বয়গলদ্রক্তধারাবিস্ফুরিতাননাম্।। ঘোররাবাং মহারৌদ্রীং শ্মশানালয়বাসিনীম্। বালার্কমণ্ডলাকারলোচনত্রিতয়ান্বিতাম্।।  দন্তুরাং দক্ষিণব্যাপিমুক্তালম্বিকচোচ্চয়াম্। শবরূপমহাদেবহৃদয়োপরি সংস্থিতাম্। শিবাভির্ঘোররাবাভিশ্চতুর্দিক্ষু সমান্বিতাম্। মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাম্।। সুখপ্রসন্নবদনং স্মেরাননসরোরুহম্। ছিন্নমস্তার ধ্যান আরও ভয়ংকর। বাস্তবিক কালীর মূর্তি, অস্ত্র, অনুচরী ডাকিনী ও যোগিনী এবং বাসস্থান ভূতশ্মশান সবই ভয়ানক ভাবের অবতার বিশেষ। কালী-সংক্রান্ত সব কিছুই যেমন ভয়ানক, তেমন আবার কৃষ্ণ সংক্রান্ত সব কিছুই আনন্দপ্রদ। কৃষ্ণের মূর্তি মনোহর। হাতে আনন্দজনক শব্দকর মুরলী। প্রিয়তমা আনন্দরূপিণী রাধিকা। মনোহর বেশধারিণী সখীগণের মধ্যে কেউ বীণা, কেউ বংশী, কেউ রবাব, কেউ মৃদঙ্গ, কেউ বা খঞ্জনী বাজাচ্ছেন। সংক্ষেপে বললে, তাঁরা নৃত্যগীতে মেতে থাকেন, নানা রকম বাদ্যযন্ত্র সুন্দর বাজাতে পারেন এবং সাদা, লাল, নীল, হলুদ প্রভৃতি নানা রঙের সুন্দর বস্ত্র পরে থাকেন। কালীর মূর্তি ও সংগ্রামকর্ম—দুইই ভয়ংকর। কৃষ্ণের মূর্তি ও নৃত্যগীতরূপ কাজ উভয়ই মনোহর। কালীর উপাসকেরা যেমন সব রকম ভয়ানক ভাবের একত্র সমাবেশ করতে যার-পর-নাই যত্নপরায়ন হয়েছেন, তেমন কৃষ্ণের উপাসকগণও আনন্দজনক ভাব সংগ্রহে, যিনি যেখান থেকে পেরেছেন, সেখান থেকে উপকরণ সঞ্চয় করে গেছেন। কালীর বাসস্থান ভয়ানক শ্মশান, কৃষ্ণের বাসস্থান মনোহর বৃন্দবন। কালীর হাতে ভয়ানক খড়্গ, কৃষ্ণের হাতে মনোহর বাঁশি। কালীর শরীর রক্তমাখা, কৃষ্ণের শরীর চন্দনমাখানো। কালী গম্ভীর গর্জন করেন, কৃষ্ণ মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন। কালী যুদ্ধে মেতে থাকেন, কৃষ্ণ নাচগান করেন। কালীর গলায় মুণ্ডমালা, কৃষ্ণের গলায় ফুলের হার। সংক্ষেপে বললে, কালীর ভয়ানক বেশ, কৃষ্ণের মূর্তি মনোহর। কালীর উপাসকরা নানারকম প্রাণী বলি দেয়, কৃষ্ণের উপাসনায় বলি নিষিদ্ধ। কালীপূজার কাল অমাবস্যা তিথি ও ঘনঘোর অন্ধকার রাত। মৃতদেহের উপর বসে, শ্মশানে তাঁর সাধনা করতে হয়। পূজার বাদ্যযন্ত্র ঢাক ও উপহারের ফুল টকটকে লাল রঙের জবা। তান্ত্রিকেরা আবার পঞ্চ-মকার দিয়ে ভয়ানক সাধনপ্রণালীর বিধানও দিয়েছেন। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন—এই পঞ্চ-মকারের প্রায় প্রত্যেকই বাইরে থেকে দেখলে এক এক ভয়ানক সাধন-প্রণালী। বাইরে থেকে—এই কথা বলার তাৎপর্য এই যে, ওই পঞ্চ-মকারের আধ্যাত্মিক ভাব অত্যন্ত নির্মল ও উচ্চ। লোকনাথ বসু তাঁর হিন্দুধর্ম মর্ম নামক বইয়ে পঞ্চ-মকার সম্পর্কে আগমসারের যে এক অংশ উদ্ধৃত করেছেন, তার তাৎপর্য এই যে, ঐ স্থানে মদ্য বলতে পানীয় মদ বোঝায় না, তা ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে ক্ষরিত অমৃতধারা বা ব্রহ্মানন্দ; মাংস মানে দেহের মাংস নয়, তা হল জিভের সংযম; মৎস্য বলতে মাছ বোঝায় না, তা হল শ্বাসনিরোধ (প্রাণায়ম); মুদ্রা মানে টাকাপয়সা নয়, বরং আত্মাতে যে পরমাত্মা মুদ্রিত হয়ে আছেন, সেই তত্ত্বজ্ঞান এবং মৈথুন বলতে যৌনসংগম বোঝায় না, তা হল জীবাত্মাতে পরমাত্মার বিরাজ।

শারদীয়া দুর্গাদেবীর কৃষ্ণানবম্যাদিবিহিত কল্পারম্ভ (১৪১৯ বঙ্গাব্দ) উপলক্ষ্যে প্রকাশিত বিশেষ রচনা।

 
4 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন অক্টোবর 9, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

দুর্গা নামের অচেনা দেবীরা

© অর্ণব দত্ত

কালীঘাট সহযাত্রীর দুর্গাপ্রতিমা–আকর্ণনয়না সাবেকি ধাঁচের দেবীমূর্তি। এ শিল্প পশ্চিমবঙ্গের সনাতন শিল্প।

দুর্গা—এই নামটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা দেবীমূর্তি। তাঁর দশ হাতে দশ রকম অস্ত্র, এক পা সিংহের পিঠে, এক পা অসুরের কাঁধে। তাঁকে ঘিরে থাকেন গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী আর কার্তিক ঠাকুর। যাঁরা সেকেলে কেতায় ঠাকুর বানান, তাঁদের ঠাকুরের পিছনে চালচিত্রে আরও নানারকম ঠাকুরদেবতার ছবিও আঁকা থাকে। আর যাঁরা আধুনিক, তাঁরা প্রতিমার মাথার উপর একখানা ক্যালেন্ডারের শিবঠাকুর ঝুলিয়ে রাখেন। মোটামুটি এই মূর্তি বছর বছর দেখে আমরা অভ্যস্ত। তবে মাঝে মাঝে পুজো উদ্যোক্তারা একটু স্বাদবদলের জন্য বানান পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা, একাদশ দুর্গা, একান্ন দুর্গা ইত্যাদি। শাস্ত্রে কতরকম মাতৃমূর্তির কথা আছে। তার থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েকটা বেছে নিয়ে পঞ্চদুর্গা, নবদুর্গা ইত্যাদি বানানো। আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি, থিমপুজো শুরু হওয়ার আগে এই সব প্যান্ডেল নিয়ে ঠাকুর-দর্শনার্থীদের মধ্যে একটা বিশেষ আগ্রহ থাকত। এখনও আছে। মায়ের সনাতন মূর্তির আবেদন কখনও ম্লান হয় না ঠিকই, কিন্তু মানুষ এই সুযোগে অন্যান্য রূপগুলি দেখে চোখ জুড়িয়ে নিতেও ছাড়েন না।

শাস্ত্রে দুর্গার নয়টি নির্দিষ্ট মূর্তিকে ‘নবদুর্গা’ বলে। এঁরা হলেন—ব্রহ্মাণী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, কৌমারী, নারসিংহী, বারাহী, ইন্দ্রাণী, চামুণ্ডা, কাত্যায়নী ও চণ্ডিকা। দুর্গাপূজার সময় দেবীদুর্গার আবরণদেবতা হিসেবে এঁদের পূজা করা হয়। আবার নবপত্রিকা (কলাবউ)-এর নয়টি গাছও নয় দেবীর প্রতীক। এঁরা হলেন—ব্রহ্মাণী (কলা), কালিকা (কচু), দুর্গা (হলুদ), জয়ন্তী (জায়ফল), শিবা (বেল), রক্তদন্তিকা (ডালিম), শোকরহিতা (অশোক), চামুণ্ডা (মান) ও লক্ষ্মী (ধান)। এঁরা পূজিত হন ‘ওঁ নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ’ মন্ত্রে।

তবে এঁরা ছাড়াও তন্ত্রে, পুরাণে আরও কয়েকজন দুর্গা-নামধারিণী দেবীর সন্ধান পাই। আবার দেবী দুর্গার অন্যান্য কয়েকটি রূপেরও দেখা পাওয়া যায়। আমরা সাধারণত দুর্গার যে মূর্তিটি শারদীয়া উৎসবে পূজা করি, সেই মূর্তিটির শাস্ত্রসম্মত নাম মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গা। স্মার্তমতে যাঁরা পঞ্চদেবতার পূজা করেন, তাঁরা জয়দুর্গার নাম ও ধ্যানমন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত। এছাড়া আছেন মহিষমর্দিনী-দুর্গা, কাত্যায়নী-দুর্গা, নীলকণ্ঠী-দুর্গা, ক্ষেমঙ্করী-দুর্গা, হরসিদ্ধি-দুর্গা, রুদ্রাংশ-দুর্গা, বনদুর্গা, অগ্নিদুর্গা, বিন্ধ্যবাসিনী-দুর্গা, রিপুমারি-দুর্গা, অপরাজিতা-দুর্গা প্রমুখ দেবীগণ। এঁরা সবাই আগম-শাস্ত্রপ্রসিদ্ধ দেবী। এছাড়া তন্ত্রশাস্ত্রে দুর্গা-নাম্নী দেবীর যে ধ্যানমন্ত্র পাওয়া যায়, সেটিও আমাদের দেখা দশভুজা-মূর্তির মতো নয়।

মহিষাসুরমর্দিনী-দুর্গাকে নিয়ে আমাদের নতুন করে কিছুর বলার নেই। দুর্গাপূজায় প্রচলিত ‘জটাজুটসমাযুক্তা’ ইত্যাদি ধ্যানমন্ত্রের আধারে নির্মিত এই দেবীমূর্তি আমাদের সকলেরই পরম-পরিচিত। তবে বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ-এ মহিষাসুরমর্দিনীর একটু আলাদা রকমের বর্ণনা আমরা পাই। চণ্ডিকা নামে উল্লিখিত এই দুর্গার দশের জায়গায় কুড়িটি হাত। শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মীর কথা আছে, এঁর হাত তাঁর থেকেও দুটি বেশি। ডান দিকের দশ হাতে থাকে শূল, খড়্গ, শঙ্খ, চক্র, বাণ, শক্তি, বজ্র, অভয়, ডমরু, ছাতা; আর বাঁদিকের দশ হাতে থাকে নাগপাশ, খেটক, পরশু, অঙ্কুশ, ধনুক, ঘণ্টা, পতাকা, গদা, আয়না ও মুগুর। বাকি সবই আমাদের চেনা মূর্তিটির মতো। দেবী কাত্যায়নী-দুর্গার মূর্তিটিও আমাদের দশভূজা-দুর্গার অনুরূপ। তবে আমাদের পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী ও তন্ত্রকথিত মহিষমর্দিনীর রূপে সামান্য ফারাক আছে। দেবী মহিষমর্দিনী অষ্টভুজা। এঁর ধ্যানে সিংহের উল্লেখ পাওয়া যায় না। দেবীকে মহিষের মাথার উপর বসে থাকতে দেখা যায়। হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ, খেটক, ধনুক, বাণ, শূল ও তর্জনীমুদ্রা। এর পূজার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল—শঙ্খপাত্রে অর্ঘ্যস্থাপনের উপর নিষেধাজ্ঞা; মৃৎপাত্রে এই কাজটি করতে হয়।

কুলাচারে পূজিতা দেবী জয়দুর্গার মূর্তিটি কিছুটা আমাদের পরিচিত জগদ্ধাত্রী মূর্তির মতো। শুধু দেবীর চার হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, খড়্গ ও ত্রিশূল এবং দেবীর গায়ের রং কালীর মতো কালো। কপালে থাকে অর্ধচন্দ্র। সিংহের পদতলে হাতি অনুপস্থিত। কেউ কেউ মনে করেন, জয়দুর্গা কালী ও দুর্গার সম্মিলিত মূর্তি।

Read the rest of this entry »

 

ট্যাগ সমুহঃ

হেনরি জেমস (১৮৪৩-১৯১৬)

জীবন

তরুণ হেনরি জেমস

হেনরি জেমসের জন্ম নিউ ইয়র্কের এক ধনী ও সম্ভ্রান্ত আমেরিকান পরিবারে। শিক্ষা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। পরে ১৮৬২ সালে তিনি আইন পড়ার জন্য যোগ দেন হার্ভার্ডে। নিউ ইংল্যান্ড লেখকগোষ্ঠীর সদস্য জেমস রাসেল লোয়েল, এইচ. ডাবলিউ. লংফেলো, উইলিয়াম ডিন প্রমুখ ছিলেন তাঁর বন্ধুস্থানীয়। হাওয়েলের অ্যাটলান্টিক মান্থলি ও অন্যান্য কয়েকটি মার্কিন পত্রিকায় লেখালিখি করতে গিয়ে জেমসের সাহিত্যজীবনের সূত্রপাত হয়। ১৮৬০-এর দশকের শেষদিক থেকে পুরনো ইউরোপীয় সভ্যতা তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করতে শুরু করে। এই সময় ইউরোপে তিনি দীর্ঘদিন কাটান। শেষে ১৮৭৫ সালে পাকাপাকিভাবে চলে আসেন লন্ডনে। ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত জেমস লন্ডনেই ছিলেন। তারপর তিনি চলে যান রাইতে। সেখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটেনের নাগরিকত্ব লাভ করেছিলেন।

সাহিত্য

জেমস ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাধর লেখক। উপন্যাস, ছোটোগল্প, ভ্রমণকাহিনি, সাহিত্য সমালোচনা, আত্মজীবনী—সব কিছুই সারাজীবন ধরে নিয়মিত লিখে গিয়েছেন। তাঁর প্রধান উপন্যাসগুলিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। রোডেরিক হাডসন (১৮৭৫) থেকে শুরু করে যে চারটি উপন্যাস আমরা পাই, সেগুলি তাঁর পরিণত উপন্যাসগুলির তুলনায় অনেক সরল সাদাসিধে পদ্ধতিতে লেখা। এগুলির মধ্যে তিনি ধরেছেন পুরনো ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও নব্য আমেরিকান সভ্যতার পার্থক্যের দিকটিকে। এই শ্রেণির অপর তিনটি উপন্যাসের নাম দ্য আমেরিকান (১৮৭৬-৭৭), দ্য ইউরোপিয়ানস (১৮৭৮) ও দ্য পোর্ট্রেট অফ আ লেডি (১৮৮১)। শেষোক্ত উপন্যাসটিকে তাঁর প্রথম জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা বলা চলে। এই উপন্যাসের সূক্ষ্ম চরিত্র বিশ্লেষণ ও সযত্ন রচনাশৈলী জেমসকে তাঁর সাহিত্যজীবনের পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। এরপর যে তিনটি উপন্যাস তিনি লেখেন, সেগুলি মূলত তাঁর ইংরেজ-চরিত্র অধ্যয়নের ফল। এগুলি হল: দ্য ট্র্যাজিক মিউজ (১৮৯০), দ্য স্পয়েলস অফ পয়েন্টন (১৮৯৭) ও দ্য অকার্ড এজ (১৮৯৯)। এগুলির মধ্যে দ্য স্পয়েলস অফ পয়েন্টন উপন্যাসটি তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্রাকার। এই উপন্যাসটি জেমসের রচনাশৈলীর বিবর্তনের অন্যতম প্রধান সাক্ষী। সাহিত্যজীবনের মধ্যগগনে তিনি রচনা করেন তিনটি উপন্যাস—দ্য উইংস অফ দ্য ডোভ (১৯০২), দ্য অ্যাম্বাস্যাডারস (১৯০৩) ও দ্য গোল্ডেন বাওল (১৯০৪)। এই তিন উপন্যাসে তিনি আবার ফিরে আসেন ইউরোপীয় ও আমেরিকান সংস্কৃতির বিরোধের জায়গাটিতে। তবে এখানে চরিত্রচিত্রণে তিনি অনেক সূক্ষ্ম এবং শিল্পসৃজনে এক দক্ষ রূপকার। তাই আধুনিক উপন্যাসের সারিতে এগুলির নাম উঠে আসে সবার আগে। তবে এই উপন্যাসগুলি রসাস্বাদনের জন্য পাঠকের গভীর মনোযোগ ও সচেতনতা দাবি করেছিল। তাই এগুলি কখনই খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। আমেরিকান জীবনধারা অধ্যয়ন করে জেমস দুটি অসামান্য বই লিখেছিলেন—ওয়াশিংটন স্কোয়ার (১৮৮১) ও দ্য বস্টনিয়ানস (১৮৮৬)। আরও দুটি বই তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯১৭ সালে দ্য সেন্স অফ দ্য পাস্টদ্য আইভরি টাওয়ার নামে প্রকাশিত হয় বইদুটি।

ছোটোগল্পেও হেনরি জেমস ছিলেন মুকুটহীন সম্রাট। তিনি প্রায় একশোটি ছোটোগল্প লিখেছিলেন, যার সূচনা হয়েছিল আমেরিকান পত্রপত্রিকার চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে। জীবনের মধ্যভাগ পর্যন্ত ছোটোগল্প লিখেছেন তিনি। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প-সংকলন সম্ভবত দ্য টার্ন অফ দ্য স্ক্রিউ (১৮৯৮)। কিন্তু অতিপ্রাকৃতের প্রতি তাঁর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি পরিস্ফুট হয় দ্য অল্টার অফ দ্য ডেড, দ্য বিস্ট ইন দ্য জাঙ্গল, দ্য বার্থ প্লেস, অ্যান্ড আদার টেলস (১৯০৯) গল্প-সংকলনে। অন্যান্য গল্পগুলি সংকলিত হয়েছে দ্য ম্যাডোনা অফ দ্য ফিউচার অ্যান্ড আদার টেলস (১৮৭৯), দ্য অ্যাসপার্ন পেপারস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ (১৮৮৮), টারমিনেশনস (১৮৯৫) ও দ্য টু ম্যাজিকস (১৮৯৮) সংকলনগুলিতে।

তাঁর আত্মজৈবনিক রচনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য— আ স্মল বয় অ্যান্ড আদারস (১৯১৩), নোটস অফ আ সন অ্যান্ড ব্রাদার (১৯১৪), এবং মরণোত্তর প্রকাশিত খণ্ড-রচনা টারমিনেশনস (১৯১৭)। (উল্লেখ্য, টারমিনেশন নামে জেমসের একটি গল্প-সংকলনও আছে, সেটি আলাদা বই।) ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় জেমসের পত্র সংকলন। এছাড়া নোটস অন নভেলিস্টস (১৯১৪), এবং প্রবন্ধ দ্য আর্ট অফ ফিকশন (১৮৮৪) তাঁর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত দ্য নোটবুক অফ হেনরি জেমস লেখককে জানার এক অতীত প্রয়োজনীয় বই।

দর্শন

হেনরি জেমস আধুনিক ঔপন্যাসিকদের মধ্যে প্রথম প্রজন্মের ব্যক্তিত্ব। তাঁর উপন্যাস এবং ভার্জিনিয়া উলফ, ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ড, কনরাড প্রমুখের উপন্যাসের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে ঐক্য দেখা যায়। উপন্যাস রচনা ছিল জেমসের দৃষ্টিতে এক শিল্প। তিনি উপন্যাসকে তাই বিচার করতেন শিল্পের দৃষ্টিকোণ থেকে, নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। এই জন্যই নিজের উপন্যাসে উদ্দেশ্য ও বাস্তব জীবনের নিরপেক্ষ উপস্থাপনাকে তিনি অতিনাটকীয় রোম্যান্স বা ভাবপ্রবণতার আধিক্যের চেয়ে উচ্চ স্থানে বসিয়েছিলেন। বাইরের ঘটনার তুলনায় মানবমনের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন তার উপন্যাসের কেন্দ্রস্থলে থাকত।

 
2 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন সেপ্টেম্বর 21, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ

পূজারম্ভের পূর্বে আচমন কেন ও কিভাবে করে?

আচমন প্রসঙ্গে পূজ্যপাদ স্বামী প্রমেয়ানন্দজি মহারাজ লিখেছেন, “দেহ-মন শুদ্ধ না থাকলে আধ্যাত্মিক সাধনের যোগ্যতা হয় না। অন্যভাবে, দেহ-মন শুদ্ধ করে নিয়ে তবে সাধন-ভজনে প্রবৃত্ত হতে হয়। আচমনের মুখ্য উদ্দেশ্য দেহ-মন শুদ্ধ করা। বিষ্ণুস্মরণ দেহ-মনশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়।… আবার আচমন পূজককে পূজার লক্ষ্য সর্বব্যাপক অখণ্ড-চৈতন্য পরমাত্মার দিকে অগ্রসর হওয়ার কথাও পরোক্ষভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।” (পূজাবিজ্ঞান, পৃ. ১৯) এই কারণে হিন্দুরা যে কোনো পবিত্র কাজ, তা সে পূজাই হোক বা অন্য কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানই হোক, তা শুরু করার আগে আচমন করে থাকেন।

আচমনের দুটি অংশ। প্রথমটি মূল আচমন প্রক্রিয়া, দ্বিতীয়টি তার আনুষঙ্গিক বিষ্ণুস্মরণ। আচমন প্রক্রিয়াটি ওঁ-কারযুক্ত শুদ্ধ বিষ্ণুনাম উচ্চারণ-সহ কয়েকটি প্রতীকী ক্রিয়া। বিষ্ণুস্মরণের সময় আমরা সাধারণত যে মন্ত্রটি উচ্চারণ করি, সেটি হল—

ওঁ   তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্। ১

ওঁ   অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।

যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।। ২

মন্ত্রটির বাংলা অর্থ—

আকাশের সূর্যের মতো সর্বত্র প্রকাশমান, বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্রে প্রসিদ্ধ, পরম তত্ত্ব জ্ঞানীগণ সর্বদা দর্শন করেন। ১

বাহ্য শরীর ও শরীরের অভ্যন্তরে স্থিত মনের কোনো একটি বা দুটিই যদি অপবিত্র হয়, তবে পদ্মলোচন শ্রীবিষ্ণুকে স্মরণ করা মাত্রই বাহ্য ও অন্তরে শুদ্ধ হওয়া যায়। ২

মন্ত্রের তাৎপর্য উল্লেখ করে প্রমেয়ানন্দজি উপসংহারে লিখেছেন, “কর্মের (পূজা) সূচনায় সাধকও প্রার্থনা করছেন—জ্ঞাননেত্রে তিনি যেন বিষ্ণুকে দর্শন করতে পারেন, তাঁর স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন ; কর্মের উদ্দেশ্য সাধনে তিনি যেন সক্ষম হন।” (তদেব)

কেউ কেউ বিষ্ণুস্মরণ মন্ত্রের সঙ্গে আরও দুটি পংক্তি জুড়ে দেন—

ওঁ   মাধবো মাধবো বাচি মাধবো মাধবো হৃদি।

স্মরন্তি সাধবঃ সর্বে সর্বকার্যেষু মাধব।।

মন্ত্রের অর্থ—

সাধুব্যক্তিদের বাক্যে মাধব (বিষ্ণু) ও হৃদয়ে মাধব। তাঁরা সকল কাজেই মাধবকে স্মরণ করে থাকেন।

আচমন পদ্ধতি

ডান হাতের তালু ‘গোকর্ণাকৃতি’ অর্থাৎ গোরুর কানের মতো করে একটি মাষকলাই ডুবতে পারে, এই পরিমাণ জল নিয়ে ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রে পান করতে হবে। এই রকমভাবে তিন বার জল পান করতে হয়। তারপর বুড়ো আঙুলের পিছন দিকটি দিয়ে ওষ্ঠ ও অধর ডান দিক থেকে বাঁদিকে দুবার মার্জনা করে সামান্য জলে হাত ধুয়ে নিতে হয়। এরপর ডান হাতের নির্দিষ্ট আঙুলের ডগা দিয়ে নিম্নলিখিত ক্রমে নির্দিষ্ট স্থানগুলি স্পর্শ করা হয়—

(১) তর্জনী+মধ্যমা+অনামিকা (একসঙ্গে)—ওষ্ঠ ও অধর।

(২) (হাত ধুতে হবে)
(৩) বুড়ো আঙুল+তর্জনী—ডান ও বাঁ নাক।

(৪) বুড়ো আঙুল+অনামিকা—ডান ও বাঁ চোখ; ডান ও বাঁ কান।

(৫) বুড়ো আঙুল+কড়ে আঙুল—নাভি

(৬) (আবার হাত ধুতে হবে)

(৭) করতল দ্বারা হৃদয় স্পর্শ করতে হবে

(৮) সবকটি আঙুলের ডগা দিয়ে মাথা, ডান ও বাঁ বাহুমূল স্পর্শ করতে হবে।

(দ্রঃ এই ক্রিয়াগুলি অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাই করে থাকেন। এগুলি যাঁরা করতে অসমর্থ তাঁরা শুধু ‘ওঁ বিষ্ণু’ মন্ত্রে জলপান করেই আচমন করেন।)

এরপর হাতজোড় করে পূর্বোক্ত আচমন মন্ত্রটি পাঠ করতে হয়—

ওঁ   তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্।

ওঁ   অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোঽপি বা।

যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।।

মন্ত্রপাঠের সময় মনে মনে শ্রীবিষ্ণুকে স্মরণ করাও আবশ্যক। কারণ, মনে রাখতে হবে সংস্কৃত আমাদের মাতৃভাষা নয়, তাই সংস্কৃত মন্ত্র শুধু পাঠ করেই আমরা তার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারি না, সেজন্য আমাদের মন্ত্রের অর্থ বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়।

নিত্যপূজায় উপরিউক্ত ক্রমেই আচমন করে। তবে বিশেষ পূজায় আচমনের পর কুশাঙ্গুরীয় ধারণ করে পাপস্খালনের জন্য নিম্নোক্ত মন্ত্রটিও পাঠ করতে হয়—

ওঁ   দেব তৎ প্রাকৃতং চিত্তং পাপাক্রান্তমভূন্মম।

তন্নিঃসারয় চিত্তান্মে পাপং হূঁ ফট চ তে নমঃ।

ওঁ   সূর্য সোমো যমঃ কালো মহাভূতানি পঞ্চ চ।

এতে শুভাশুভস্যেহ কর্মণো নব সাক্ষিণঃ।।

 
4 টি মন্তব্য

Posted by চালু করুন সেপ্টেম্বর 18, 2012 in পুরনো লেখা

 

ট্যাগ সমুহঃ