RSS

প্রাক-কংগ্রেসি জাতীয়তাবাদী সংগঠন

16 আগস্ট

উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ভারতীয়দের কাছে বিদেশি শাসকের শোষক রূপটি প্রকট হয়ে পড়লে, তাঁরা ভারতের জন্য একটি কল্যাণ ও উন্নয়নমুখী নীতির পক্ষে সওয়াল শুরু করেন। জাতীয়তাবাদীদের সংগঠিত আন্দোলন শুরু হয় উনিশ শতকের শেষ দশকে, তবে রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল তার অনেক আগে। ১৮৫০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রেসিডেন্সিগুলির রাজধানীতে কয়েকটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এই সব সংগঠনের সদস্যরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রভাব খাটিয়ে ১৮৫৩ সালের সনদের পুনর্নবীকরণ করতে চেয়েছিলেন। পরের দুই দশক ভারতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল এই সংগঠনগুলিই।

বাংলার সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক সংগঠন ছিল ল্যান্ডহোল্ডারস’ সোসাইটি (১৮৩৮) ও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সোসাইটি (১৮৪৩)। এই দুটি সংগঠন পরে এক হয়ে গঠন করে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৫১)। এর প্রথম সভাপতি  ও প্রথম সচিব হন যথাক্রমে রাধাকান্ত দেব ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকু্র। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে উল্লেখ করা যায় রামগোপাল ঘোষ ও প্যারীচাঁদ মিত্রের নাম। অ্যাসোসিয়েশনের মুখপত্র হিন্দু প্যাট্রিয়ট -এর ভাষা ছিল রাজনৈতিকভাবে বেশ উগ্র। ১৮৫২ সালে এই সংগঠন প্রথম ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি দরখাস্ত পাঠায়। তাঁদের দাবি ছিল আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের পৃথকীকরণ, উচ্চ সরকারি পদে আরও বেশি সংখ্যায় ভারতীয়দের নিয়োগ, ইংল্যান্ড ও ভারতে একই সঙ্গে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহণ, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিস্তার, লবণ শুল্ক,অন্তঃশুল্ক (এক্সাইজ ডিউটি) ও মুদ্রাঙ্ক শুল্কের (স্ট্যাম্প ডিউটি) বিলোপ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অনুদান বৃদ্ধি। ১৮৫৩ সালের সনদে এই সব দাবির একটিও মানা হয়নি। তাই অ্যাসোসিয়েশন আন্দোলন চালিয়ে যায়। তবে এই নরমপন্থী লাভের লাভ কিছু হয়নি।

ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের দেখাদেখি গড়ে ওঠে বম্বে অ্যাসোসিয়েশন (১৮৫২) ও মাদ্রাজ নেটিভ অ্যাসোসিয়েশন (১৮৫২)। এগুলি গড়ে তুলেছিলেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি। এদের কাজকর্মও তাই প্রাদেশিক বা স্থানীয় স্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল।

১৮৬০ সালের পর থেকে ব্রিটিশ ভারতীয় প্রশাসন সম্পর্কে শিক্ষিত ভারতীয় সমাজের মোহভঙ্গ হয়। তদনীন্তন অ্যাসোসিয়েশনগুলিকে তাঁরা স্থবির ও প্রতিক্রিয়াশীল মনে করেন। রাজনৈতিক কার্যকলাপের বৃদ্ধি এই অসন্তোষকে প্রকাশ করতে থাকে। ১৮৬৬ সালে দাদাভাই নওরোজির উদ্যোগে লন্ডনে গঠিত হয় ইস্ট ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ জনগণ ও পার্লামেন্টকে ভারত সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান। সংগঠনটি ভারতের একাধিক সমস্যার কথা তুলে ধরে কিছু সমাধানও প্রস্তাব করে। ১৮৬৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বোম্বাই, কলকাতা ও মাদ্রাজে শাখা স্থাপন করে। যদিও ১৮৮১ সালের মধ্যেই এই সংগঠনটি জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে।

১৮৬৭ সালে মেরি কারপেন্টার স্থাপন করেন ন্যাশানাল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। ১৮৭৩ সালে আনন্দমোহন বসু লন্ডনে স্থাপন করেন ইন্ডিয়ান সোসাইটি।

১৮৬৭ সালে জাস্টিস রাণাডে এবং অন্যান্যরা মিলে স্থাপন করে পুনা সার্বজনিক সভা। ভারতীয়দের অর্থনীতি বিষয়ে সচেতন করে তুলতে এই সংগঠন একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা বের করেন। ১৮৭৬ সালে বাংলার দুই তরুণ জাতীয়তাবাদী সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু স্থাপন করেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। ১৮৮৪ সালে এম বীররাঘবাচারিয়ার, জু সুব্রহ্মণ্য আয়ার, পি আনন্দ চন্দু প্রমুখ তরুণ জাতীয়তাবাদীরা স্থাপন করেন মাদ্রাজ মহাজন সভা। ১৮৮৫ সালে বোম্বাইতে উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা কে টি তেলাং ও ফিরোজশাহ মেহতা প্রবীণ নেতাদের থেকে আলাদা হয়ে স্থাপন করেন বোম্বাই প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশন।

প্রাক-কংগ্রেসি জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভারত সভা বা ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন। এর উদ্দেশ্য ছিল একটি বলিষ্ঠ জনমত গঠন, একটি সাধারণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সারা দেশের মানুষকে জড়িয়ে ফেলা এবং সংগঠনের ভিত্তি প্রসারিত করা। গরিব মানুষকে সদস্য করার জন্য এই সংগঠন সদস্যপদের চাঁদাও কম ধার্য করেছিল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা দ্য বেঙ্গলি পত্রিকা ছিল এই সংগঠনের মুখপত্র।

ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রথমেই যে ইস্যুটি নিয়ে সরব হয়, সেটি ছিল ভারতীয় পরীক্ষার্থীদের সুবিধার্থে আইসিএস পরীক্ষার বয়ঃসীমা হ্রাস। ১৮৭৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়সের উর্ধ্বসীমা ২১ থেকে কমিয়ে করে ১৯ বছর। ১৮৭৭-৭৮ সালে এর বিরুদ্ধে জনমত সংগ্রহ করতে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের নানা প্রদেশ সফর করেন। লর্ড লিটনের ভার্নাকুলার প্রেস আইন ও অস্ত্র আইনের বিরুদ্ধেও অ্যাসোসিয়েশন আন্দোলন চালায়। ভার্নাকুলার প্রেস বা দেশীয় সংবাদমাধ্যম ছিল জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রসারের একটি প্রধান অঙ্গ। ১৮৭৮ সালে ভার্নাকুলার প্রেস আইনে বলা হয়, সরকার যদি মনে করে কোনো সংবাদপত্র রাজদ্রোহমূলক কিছু প্রকাশ করছে, তাহলে তারা আগে থেকে সতর্ক না করেই সেই সংবাদপত্রের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। ১৮৭৮ সালেই অস্ত্র আইন পাস করা হয় ভারতীয়দের নিরস্ত্র করার জন্য। বলা হয়, সকল ভারতীয়কে অস্ত্র রাখার জন্য লাইসেন্স নিতে হবে। ১৮৮৩-৮৪ সালে অ্যাসোসিয়েশন একটি কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। আন্দোলনটি ছিল জমিদারদের সুবিধা অনুযায়ী রেন্ট বিল বাড়ানোর বিরুদ্ধে। তাছাড়া ইংরেজ-পরিচালিত খেতখামারের মজুরদের কাজের সুপরিবেশের দাবিতেও অ্যাসোসিয়েশন আন্দোলন করে। ১৮৮৪ সালে বাংলার শহর ও গ্রামে অ্যাসোসিয়েশনের ৪৪টি শাখা গড়ে ওঠে। বাংলার বাইরে গড়ে উঠেছিল আরও বেশি।

১৮৮৩ সালে লর্ড রিপনের আনা ইলবার্ট বিলের স্বপক্ষেও ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন সারা ভারতে জনমত গড়ে তোলে। এই বিলে ভারতীয় ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও সেশন জজদের ইউরোপীয় আসামীদের বিচার করার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আগেকার আইনে ভারতীয় আইসিএসরা আদালতে ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারত না। স্বভাবতই ইউরোপীয়ানরা এই বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। স্থাপিত হয় ইউরোপীয়দের ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন। এই সংগঠনের কাজ ছিল ভারতবাসী ও তাদের সভ্যতাকে গালাগালি করা। সরকার তাদের চাপের কাছে মাথা নত করে। বিলে সংশোধনী আসে: কোনো ইউরোপীয় আসামীকে ভারতীয় ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা সেশন জজের কাছে বিচারের জন্য আনা হলে, আসামী অর্ধেক ইউরোপীয় সদস্য-যুক্ত জুরির কাছে বিচারের দাবি জানাতে পারবে।

ইউরোপীয়দের জাতিবিদ্বেষ ভারতীয়দের স্তম্ভিত করে দেয়। তা অবশ্য ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে পূর্ণ সহায়ক হয়। একই সঙ্গে ভারতীয়রা রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের চিন্তাভাবনাও শুরু করেন। ১৮৮৩ সালের ডিসেম্বরে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন একটি সর্বভারতীয় জাতীয় সম্মেলন বা অল ইন্ডিয়া ন্যাশানাল কনফারেন্স ডাকে। সারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের একশো প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেন। ১৮৮৫ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় কনফারেন্সের দ্বিতীয় অধিবেশন বসে। একই সময় বোম্বাইতে বসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন। ১৮৮৬ সালের ডিসেম্বরে কনফারেন্স মিশে যায় কংগ্রেসে।

এই রাজনৈতিক গতিধারায় ১৯১৮ সালের আগে একের পর এক প্রধান জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রগুলির জন্ম হয়। প্রকাশিত হয় হিন্দু, ট্রিবিউন, বেঙ্গলি, মারাঠা, কেশরীঅমৃতবাজার পত্রিকা। ১৮৭৮ সালে ভার্নাকুলার প্রেস আইনের প্রতিবাদে অমৃতবাজার পত্রিকা  রাতারাতি পরিণত হয় ইংরেজি দৈনিকে। সংবাদপত্রের মাধ্যমেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জাতীয়তাবাদীরা একে অপরের কাজকর্ম সম্পর্কে অবহিত হতে শুরু করেন।

 

ট্যাগ সমুহঃ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: