RSS

ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ

07 আগস্ট

"ভারতমাতা", অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর১৮৫৮ সালে সমগ্র ভারত প্রত্যক্ষভাবে ব্রিটিশ রাজশক্তির অধীনে আসে। ভারতের সকল ব্রিটিশ-শাসিত অঞ্চলে চালু হয় একটি অভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং একটি অভিন্ন ব্রিটিশ আইন। ভারতীয়রা সকলে এককভাবে ব্রিটিশ শাসনের ছাতার তলায় আসেন। দেশের এই রাজনৈতিক একীকরণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিভূমি রচনা করে। এই একীকরণের অন্যতম অঙ্গ ছিল রেলপথ, টেলিগ্রাফ, ডাকবিভাগ, সড়ক পরিবহণের উন্নতি। এই সব আধুনিক পরিকাঠামো ইংরেজরা নিজেদের স্বার্থে গড়ে তুললেও, দেশের ঐক্যসাধনে এগুলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ১৮৫৩ সালে অর্থনৈতিক সংহতিসাধনের অঙ্গ হিসেবে রেলপথের যাত্রা শুরু হয়। দুই দশকের মধ্যে দেশের সব প্রধান শহরই রেলপথের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে পড়ে। আগে ভারতের গ্রামগুলির মধ্যে একটা বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মনির্ভরতার ভাব ছিল। রেলপথের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্দেশীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি পেলে তা নষ্ট হয়ে যায়। দেশের অঞ্চলগুলি পরস্পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ভারতে কাঁচামাল ও পণ্যের একটা জাতীয় বাজার সৃষ্টি হয়। শ্রমিকরাও দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।

উনিশ শতকের ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে বিশেষ সহায়ক হয়। সংস্কার আন্দোলন এক বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের পথ প্রশস্ত করে। সংস্কারকেরা পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণার পরিবর্তে দেশীয় সংস্কৃতির পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। হিন্দুধর্মের সংস্কার ও হিন্দু সংস্কৃতির এক যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা জনসাধারণের মধ্যে এই ধর্মের ভিত সুদৃঢ় করে তোলে। দেশের জনগণের মনে হিন্দুধর্ম-কেন্দ্রিক এই আধ্যাত্মিক ঐক্যসাধনও বিশেষ প্রভাব ফেলে।

সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে ছিল দেশীয় ভাষার সাহিত্যও। নতুন চিন্তাধারণার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই সাহিত্যে লাগে দেশাত্মবোধের ছোঁয়া। জাতীয়তাবাদী সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকারের জন্ম হয়েছিল বাংলায় – তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি সংগ্রামী জাতীয়তাবাদের উন্মেষে বিশেষ অনুপ্রেরণার কাজ করে। আনন্দমঠ (১৮৮২) উপন্যাসের বন্দেমাতরম্‌ গানটি পরিণত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের রণসংগীত এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের জাতীয় স্তোত্রে।

উনিশ শতকের প্রথম পাদের ভারতীয় মণীষীগণ ছিলেন ব্রিটিশ শাসনের পক্ষপাতী। শুধু তাই নয়, তাঁরা ব্রিটিশ শাসনকে দেশের পক্ষে কল্যাণকর মনে করতেন। তাঁরা ভাবতেন, সেকালের দুনিয়ায় সবচেয়ে উন্নত রাষ্ট্র ব্রিটেন আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং এক ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলন ঘটিয়ে ভারতকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে তাঁদের চোখ খুলে যায় ১৮৬০ সালের পর থেলে। বিদেশি শাসনের অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উনিশ শতকের দ্বিতীয় পাদের ভারতীয় মণীষীগণ ঔপনিবেশিক শাসকদের শোষণকারী চরিত্রটি সম্পর্কে সম্যক অবহিত হয়ে ওঠেন। এই বিশ্লেষণ ছিল জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বিকাশে তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলির অন্যতম।

১৮৬৬ সাল থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে ভারতে পরপর কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষের ঘটনা ঘটে। এই দুর্ভিক্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে সমৃদ্ধির দিবাস্বপ্ন ভেঙে দেয়। মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্যের সঙ্গে সঙ্গে অনুন্নত ভারতের প্রকৃত ছবিটি বেআব্রু হয়ে পড়ে। ১৮৭৫-১৯০৫ সময়পর্বে তিন জন মণীষী ব্রিটিশ ভারতীয় অর্থব্যবস্থাটি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। দাদাভাই নওরোজি দারিদ্র্য নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি ব্রিটিশ নীতি, বিশেষত সম্পদ পাচারের নীতির সঙ্গে দারিদ্র্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকটি তুলে ধরেন। ১৭৫৭ সালের পর থেকে ব্রিটিশ আর্থিক নীতির তিনটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলে ধরেন রমেশচন্দ্র দত্ত – কুটির শিল্পের বিনাশ, আধুনিক ভারতীয় শিল্পের ক্রমাবনতি এবং মাত্রাতিরিক্ত ভূমিরাজস্বের বোঝা। জাস্টিস মহাদেব রাণাডে আধুনিক শিল্পের বিকাশের উপর জোর দেন। পরবর্তীকালে, জি ভি যোশী, সুব্রহ্মণ্য আয়ার, গোপালকৃষ্ণ গোখেল ও প্রফুল্লচন্দ্র রায় ভারতীয় অর্থনীতির ঔপনিবেশিকরণের দিকটি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, ঔপনিবেশতাবাদই ভারতীয় অর্থনীতির বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায়।

ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রটিও ছিল সম্পূর্ণ শ্বেতাঙ্গ-চালিত, স্বৈরতান্তিক ও অর্থনৈতিক শোষণের প্রতি নিবেদিত-প্রাণ। অবশ্য মাঝে মাঝে ব্রিটিশ রাজের প্রকৃত স্বরূপটি ঢাকা দেওয়ার জন্য তারা ট্রাস্টিশিপ এবং স্বায়ত্বশাসনের জন্য ভারতীয়দের প্রশিক্ষিত করার কথা বলত। ১৮৬১ সালে হাতে-গোনা কয়েকজন ভারতীয় প্রাদেশিক ও সুপ্রিম কাউন্সিলে মনোনয়ন পান। কিন্তু তার পরই তাঁদের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়। এমনকি রিপনের চালু করা স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থাও ছিল মূলত অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি পদক্ষেপ। ১৮৮০-এর দশকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের ৯০০টি পদের মধ্যে ১৬টি বাদে সব কটিই রাখা ছিল ইউরোপীয়দের জন্য। সেনাবাহিনীতেও ব্রিগেডিয়ারের উপরে কোনো পদে ওঠার ক্ষমতা ছিল না ভারতীয়দের। তাই প্রশাসনের নিচের স্তরেই শিক্ষিত ভারতীয়দের চাকরির সুবিধা আবদ্ধ ছিল।

একই সঙ্গে ব্রিটিশদেরও বন্ধুরও প্রয়োজন ছিল। মহাবিদ্রোহ-উত্তর কালে তাঁরা দেশীয় রাজ্যের রাজা, জমিদার এবং নানা ধরনের গ্রামীণ ও পৌর অভিজাত ব্যক্তিদের সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরাই হয়ে ওঠে তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্রশক্তি।

এই সময় থেকেই নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখতে ব্রিটিশরা সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণভেদ ও আঞ্চলিকতায় উসকানি দিতে শুরু করে। সমাজ সংস্কারের সব প্রক্রিয়া বর্জন করে তারা পশ্চাদপন্থী রক্ষণশীল সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক শক্তিগুলিকে সহায়তা দিতে শুরু করে।

 

ট্যাগ সমুহঃ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

 
%d bloggers like this: